আগস্ট ট্র্যাজেডি নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীরা

 আগস্ট ট্র্যাজেডি নেপথ্যের ষড়যন্ত্রকারীরা

মুহম্মদ শফিকুর রহমান, এমপি

এবারের আগস্ট ভিন্নমাত্রা নিয়ে হাজির হয়েছে। বছরটি মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালির জাতিরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী বা ৫০ বছরপূর্তি। এই স্মরণীয়-বরণীয় বছরটিতে কোভিড-১৯ বা করোনার নির্দয় উপস্থিতি মহামারি রূপ ধারণ করে গোটা মানবজমিন কবরস্থানে পরিণত করেছে। এরই মধ্যে অর্ধকোটির বেশি মানবসন্তান প্রাণ হারিয়েছেন। কোভিড কোথায় গিয়ে ঠেকবে বা এর শেষ কোথায়, তা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই কেবল বলতে পারবেন। আসুন, আমরা সবাই মিলে তাঁর কাছেই প্রার্থনা জানাই বিপদমুক্তির।
আগস্ট ট্র্যাজেডির ওপর বিগত ৪৬ বছর অনেক আলোচনা হয়েছে, সেমিনার হয়েছে, সংবাদ হয়েছে, জার্নালিস্টিক কলাম লেখা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে, কতিপয় খুনির মৃত্যুদণ্ড- কার্যকর করা হয়েছে, খুনিদের কয়েকজন এখনো দেশের বাইরে বিভিন্ন দেশে আত্মগোপন করে আছে। কিন্তু নেপথ্যের খুনি পরিকল্পনাকারী রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক মুখোশধারীদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। তারা চিহ্নিত নয় বলে রাজাকার-আলবদরদের মতো অনেকেই সমাজে সাদা-কাপড় পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই দাবি উঠেছে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন করে ওই বর্ণচোরা খুনিদের মুখোশ উন্মোচন করার। যাতে ওই খুনিদের নাম প্রকাশ্যে চলে আসে এবং বংশানুক্রমে সমাজে ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকে। যেমন খুনি মোশতাকের লাশ তার গ্রামের বাড়ি দাউদকান্দি নিয়ে যাওয়ার সময় পথের দুধারে দাঁড়িয়ে মানুষ থুতু ছিটিয়েছে। ঘৃণা এড়ানোর জন্য লাশ মধ্যরাত শেষে নিয়ে যাচ্ছিল, তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। এখনো মীরজাফরের কবরে মানুষ পাথর ছুড়ে ঘৃণা প্রকাশ করে।
পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে দুইবার ফাঁসিতে হত্যা করার চেষ্টা করা হয় বঙ্গবন্ধুর কারাকক্ষের পাশে কবরও খনন হয়েছিল; কিন্তু শেষপর্যন্ত তাঁকে হত্যা করার সাহস করেনি। এর অনেক কারণ আছে। বিশ্ববিবেক তখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির পক্ষে। ভারতের তৎকালীন মহীয়সী প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর (ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী) ভূমিকা সবার আগে। ’৭১-এর সেপ্টেম্বরে তিনি বিশ্বভ্রমণে বের হন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বর্বর সামরিক জান্তার গণহত্যা ও ধর্ষণের বিপক্ষে জনমত সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারামুক্তির পক্ষে বিশ্ববিবেকের হৃদয়ে একটা চেতনা জাগিয়ে তোলেন। পাকিস্তানি জান্তা তাই আর সাহস পায়নি।
দ্বিতীয়ত. পাকিস্তানের মাটিতে তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি এজন্য যে, পাকিস্তান চিরকাল এজন্য দায়ী হবে এবং দেশটির পেছনে যেসব পরাশক্তি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, তারাও অভিযুক্ত হবে। অবশ্য তাদের সেই বোধ নেই। তারা তাদের সাম্রাজ্যবাদী চিন্তা থেকে বিশ্বের জনপ্রিয় এবং শোষিত-বঞ্চিত মানুষের জাতীয়তাবাদী নেতাদের হত্যা করে তাদের কিসিঞ্জারি শয়তানি অব্যাহত রেখেছে।
তৃতীয়ত. তারা বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের মাটিতে হত্যা না করে বাংলাদেশের মাটিতে হত্যা এবং এজন্য বাঙালিদের বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে দায়ী করার সুযোগ পাবে। তারা তাদের এ লক্ষ্য বিজয়ের সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের মাটিতে কার্যকর করল। যে কারণে মির্জা ফখরুলরা আজও সেই ঢেড়া পিটিয়ে চলেছে।
চতুর্থত. মির্জা ফখরুলরা মোশতাকের কথা বলে আওয়ামী লীগকে দায়ী করলেও খুনি মিলিটারি জিয়াকে আড়াল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু এই মিলিটারি জিয়া খুনি মোশতাকের মতোই নৃশংস নির্দয়। বরং বলা যায়, মোশতাকের চেয়েও এক পা এগিয়ে। যে কারণে ৩২ নম্বরের বাড়িতে উপস্থিত একজন মানুষকেও বাঁচতে দেয়নি। এমনকি শিশু শেখ রাসেল বা অপর বাড়িতে সুকান্ত বাবুর বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করতে তাদের এতটুকু বুক কাঁপেনি। মূলত হত্যাকা-ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মূলহোতা কিন্তু মোশতাক নয়, তাদের মূল লোক হলো মিলিটারি জিয়া। যে কারণে দেখা গেছে, ১৫ আগস্টের পর একটার পর একটা ক্যু করে রাজনীতির অঙ্গনকে বিশৃঙ্খল করে তুলে অতি অল্পদিনেই জিয়াকে সামনে নিয়ে আসে এবং রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। বাংলাদেশকে আবার একটি মিনি পাকিস্তান বানানোর আয়োজন করে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের বাঙালি আর জাতির পিতার রক্ত যে মাটিতে, সে মাটি কাউকে ক্ষমা করেনি, করবে না। বঙ্গবন্ধুকন্যা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে, বাংলাদেশ আজ কোনো সাম্রাজ্যবাদকে কেয়ার করে না, বরং এগিয়ে চলেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। বিশ্ব এখন অবাক বিস্ময় বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী দশকে বাংলাদেশ আজকের অবস্থানে আসত। একটু দেরি হয়ে গেল, তারপরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এমন শক্তি নেই। দোয়া করি তিনি বেঁচে থাকুন বাঙালি জাতি এবং বঙ্গবন্ধুর ‘আমার গরিব দুঃখী মানুষের’ জন্যই, আল্লাহপাক তাঁর নেকহায়াত দান করুন।
মিলিটারি জিয়া যে মূল খুনি, তা তো যারা গুলি চালিয়েছিল এমন খুনিরাই বিদেশের মাটিতে গ্রানাডা টেলিভিশন ইন্টারভিউ দিয়ে বলে গেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পূর্বক্ষণে খুনিরা ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে জিয়ার সঙ্গে দেখা করে। তাদের মধ্যে হত্যার আগে ও পরে যে কথা হয়েছে:
ক. আমরা অভ্যুত্থান ঘটাতে চাই
খ. I am a senior army officer. I can’t involve directly, if you are serious, go ahead. এই I can’t involve directly এবং go ahead -এর অর্থ বোঝার জন্য পণ্ডিত হতে হয় না, মিলিটারি জিয়ার mental faculty তখন কী লালন করছিল, তা বোঝার জন্য জেনারেল হওয়ার দরকার নেই।
গ. হত্যাকাণ্ডের পর ভোর ৫টার মধ্যেই জিয়া ক্লিনশেভ করে ইউনিফর্ম পরে তৈরি ছিলেন। কেন? এ সময় যারা তার সাথে দেখা করেছেন এবং রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার খবর দিলে জিয়া বলেছিলেন:
ঘ. So what, vice president is there
জিয়ার এসব মন্তব্য ১৫ আগস্টের পর থেকে আজও মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এক
এবার দেখব ‘৭২ থেকে ‘৭৫ পর্যন্ত কী কী ঘটেছিল। কারা ওইসব ঘটনার কুশীলব? গত ৫০ বছরে আমি আবিষ্কার করতে পারলাম না দেশ স্বাধীন হলো, অর্থাৎ শত্রুমুক্ত হয়ে বিজয় অর্জিত হলো, ঠিক এর তিন-চার মাসের মাথায় এমন কী কারণ ঘটেছিল যে জাসদের জন্ম হলো? প্রথমে জাসদ ছাত্রলীগ এবং পরে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল জাসদ?
প্রথম থেকে দলটির একটা সন্ত্রাসী চেহারা দেশবাসী দেখতে থাকল। দলের প্রধান হলেন রণাঙ্গনের এক সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল এবং সাধারণ সম্পাদক ডাকসুর ভিপি আ স ম আবদুর রব। মেজর জলিলকে দলের প্রধান করে দলটি স্পষ্ট করে যে, এটি মিলিটারী গোষ্ঠীর একটি কর্মসূচি মাত্র। অবশ্য এর নেপথ্য নায়ক সিরাজুল আলম খান। তিনি নেপথ্যচারী বা কাপালিক নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। জাসদের নেতাকর্মীর কাছে দাদা। চেহারায় অবয়বে দাদাই বটে। লম্বা সাদা চুল তার চেয়ে লম্বা সাদা দাড়ি গোঁফ এসব তার ছদ্মবেশের আরেক রূপ। এতে করে তিনি নিজে প্রচ- রকম এক বুদ্ধিদীপ্ত পলিটিক্যাল লিডার বা তাত্ত্বিক নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হন। কেউ কেউ মনে করতেন, সাদা চুল দাড়ি গোঁফের বনায়ন সৃষ্টি করে তিনি রবীন্দ্রনাথ হওয়ার চেষ্টা করতেন। তবে এতে তার চেয়েও বেশি সফল হয়েছেন বন্ধু কবি নির্মলেন্দু গুণ। পার্থক্য রবীন্দ্রনাথের মতো জুব্বা পরেন না।
দুই.
একদিকে জাসদের গণবাহিনীর তৎপরতা আল্ট্রা বামদের আঁধারের নৃশংসতা, তার ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কিসিঞ্জারি বুদ্ধি। একে একে মানুষের জীবন চলে যেতে থাকল। পাটের গুদামে আগুন, পেট্রোল পাম্পে বোমা, বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা, ব্যাংক ডাকাতি এমনই সব নাশকতা শুরু হলো। আওয়ামী লীগের পাঁচজন এমপিকে হত্যা করা হলো। একজনকে তো ঈদের নামাজ পড়া অবস্থায় জামাতে গুলি করে হত্যা করা হলো। আর মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’ জাসদের ‘গণকণ্ঠ’ অলি আহাদের ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকা ওই সব কর্মকা- ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে প্রচার করতে থাকল। আ স ম আবদুর রব তার দলীয় সমাবেশে বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন সব অশ্লীল অশালীন উক্তি করতেন যা কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে উচ্চারণ করা সম্ভব নয়। তাদের গণকণ্ঠও ছিল হক কথার ডেইলি সংস্করণ। গণকণ্ঠে এমন সব রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় ছাপা হতো, পড়তে শুরু করলে পুরো শরীর কাঁপত।

তিন.
হোম মিনিস্টারের বাড়িতে সন্ত্রাসী হামলা। কয়েক হাজার জাসদকর্মী হোম মিনিস্টারের মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে হামলা চালাল। গুলি ছুড়তে শুরু করল। ভেতর থেকেও গুলি চালানো হলো এবং তাতে কয়েকজন মারা গিয়েছিল শুনেছি। দৈনিক ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসাবে ওই ইভেন্ট কাভার করতে মিছিলের শেষভাগে হাঁটছিলাম। হঠাৎ গুলির শব্দে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কী করব প্রথমদিকে বুঝতে পারছিলাম না। একপর্যায়ে লাফ দিয়ে রমনা পার্কের দেওয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে ক্রলিং করতে করতে পার্কের দক্ষিণের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসি। পরে জানতে পেরেছি মিছিল থেকে প্রথম গুলি চালানো হয় উসকানি দেওয়ার জন্য। তারপরই ভেতর থেকে পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়, তাতে কয়েকজন নিহত হন। ওই উসকানিটি কেন, কয়টা লাশ পড়ল, লক্ষ্য কী তবে ছিল লাশের ইস্যু বানানোর জন্য? এ প্রশ্ন রয়ে গেছে।

চার.
কিছু সাংবাদিক বা সংবাদপত্রসেবীও যে নেপথ্য জড়িত ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যায়, তারও কিছু কিছু আভাস পাওয়া যায়। একটি তথ্যে জানা যায়, পঁচাত্তরে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বাংলাদেশ করেসপনডেন্ট ছিলেন আতিকুল আলম। ১৫ আগস্ট খুনিরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে প্রথম গুলিটি ছোড়ার অন্তত ১৫ মিনিট আগে একটি নিউজ ফ্ল্যাশ করে Bangladesh president sheikh mujibur rahman, who is also the founding father of the nation, was assassinated…..
প্রশ্ন হলো–গুলি করার ১৫ মিনিট আগে আতিকুল আলম কীভাবে জানলেন হত্যাকাণ্ডের কথা? এ থেকে কি প্রমাণিত হয় না আতিকুল আলম আগেই জানতেন, কখন গুলিটি ছোড়া হবে? এমনটি ভাবা হলে কি কাউকে দোষ দেওয়া যাবে? হত্যাকাণ্ডের কয়েক মিনিট পর মিলিটারি জিয়াউর রহমানকে দেখা গেছে ক্লিনসেভ এবং আর্মি ইউনিফর্ম পরে আছেন যেন তিনি কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে আছেন।

পাঁচ.
এত বড়ো হত্যাকাণ্ডের জন্য নিশ্চয়ই বড়ো ধরনের একটা প্রস্তুতির কিংবা প্ল্যানিংয়ের প্রয়োজন পড়ে এবং তা ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট কিংবা আগামসি লেনে ঘটেছে। বিশেষ করে ক্যান্টনমেন্টে থেকে ট্যাংক কোনো ওকেশন ছাড়া কেন বেরোলো, তা কেউ জানলো না। কোনো মিলিটারী অফিসারের মনে প্রশ্ন জাগলো না এমনটিও কি বিশ্বাস করতে হবে? জিয়ার স্ত্রী খালেদাও কিছু জানলেন না তা-ও বিশ্বাস করা যাবে?
যতদূর জানা যায়, খুনিরা ৩২ নম্বরের বাসভবনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু আর্মি চিফ অব স্টাফ জেনারেল শফিউল্লাহ, ডেপুটি চিফ-অব-স্টাফ জেনারেল জিয়া এমন অনেককেই টেলিফোন করে সাহায্য চেয়েছেন কিন্তু কেউ আসেনি। কেবল কর্নেল জামিল এসে জীবন দিয়েছেন। জীবন দিয়েছেন আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মণিসহ অনেকেই। কেবল তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পরই খন্দকার মোশতাক আমন্ত্রণ জানালে অনেকেই সুড়সুড় করে বঙ্গভবনে চলে যান এবং তাকে সমর্থন জানান। কেউ কেউ আওয়াজ করে সমর্থন না জানালেও মৌন সমর্থন ছিল। শুনেছিলাম কেবল একজন অ্যাডভোকেট সিরাজুল হক প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

ছয়.
ডাকসু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

সাত.
ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের বিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলে ৭ ছাত্র খুন

আট.
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে তোপখানা রোডে ইউসিস অফিসে মস্কো বামদের অগ্নিসংযোগ। পুলিশের গুলিতে ১ জনের প্রাণহানি।

নয়.
১৯৭৩-এর বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং খরা-বন্যা

দশ.
১৯৭৪ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং বন্যাক্রান্ত অঞ্চলগুলোয় ফসলহানিজনিত দুর্ভিক্ষ যা কেবল প্রাকৃতিক ছিল না, অনেকখানি মনুষ্যসৃষ্ট ছিল। বঙ্গবন্ধু সরকার তখন নগদ অর্থ দিয়ে চাউল কিনেছিলেন কিন্তু চাউলের জাহাজ চট্টগ্রাম মোংলা বন্দরে না ভিড়ে চলে যায় বোম্বে বন্দরে। এটাকে যতই দিগভ্রান্ত বলা হোক এটিও দুর্ভিক্ষ লাগানোর চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়। কিসিঞ্জারের চক্রান্তও ছিল। তার তলাবিহীন ঝুড়ি বলাটা এমনি এমনি ছিল না।

এগারো.
এবার কিসিঞ্জারি চক্রান্তের দিকে একটু তাকাই। চক্রান্ত শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের মাঝে কলকাতায়। তখন মোশতাক ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর মেজর জিয়া জেড ফোর্স প্রধান। তাদের সঙ্গে ছিল তাহের ঠাকুর, মাহবুব আলম চাষী গং। তারা মুজিবনগর সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করতে হলে পাকিস্তানের সঙ্গে একটা লুজ কনফেডারেশন করা যেতে পারে। মোশতাক-জিয়া এমনও বলেছিলেন আপনারা বঙ্গবন্ধুকে চান না স্বাধীনতা চান। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ উত্তরে বলেছিলেন লুজ টাইট বুঝি না আমরা মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ও অর্জন করব, বঙ্গবন্ধুকেও মুক্ত করে আনব, ইনশাআল্লাহ। মোশতাক আরেকটি চক্রান্ত করেছিলেন জাতিসংঘের পরবর্তী সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে কনফেডারেশনের কথা বলা যায় কিনা ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এটি প্রকাশ পেয়ে গেলে তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

বারো.
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিবেশ সৃষ্টিতে আরও অনেক ঘটনা আমরা ইত্তেফাকের নিউজ টেবিলে বসে শুনেছি। যেমন কখনো তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বিভেদ, কখনো শেখ ফজলুল হক মণির সাথে দ্বন্দ্ব এসব তখন ওপেন সিক্রেট ছিল। তাজউদ্দীন আহমদের মন্ত্রিসভা থেকে চলে যাওয়ায় ওইসব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। অথচ তাঁরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁদের কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না।

তেরো.
দৈনিক ইত্তেফাক কম ভূমিকা রাখেনি হত্যাকাণ্ডের পরিবেশ সৃষ্টিতে। ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ কাভার করার জন্য ইত্তেফাকের পক্ষে রংপুরে শফিকুল কবির ও আফতাব আহমেদ এবং ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা অঞ্চলে আমি ও রশীদ তালুকদার। অপর তিনজন আর জীবিত নেই। সেদিনের বাসন্তী দুর্গতির ‘জালপরা ছবি’ দুর্ভিক্ষের সিম্বল হয়েছিল এবং যা ছিল সম্পূর্ণরূপে একটি বানোয়াট ঘটনা। বাসন্তীকে ১০ টাকা দিয়ে কবির ও আফতাব আহমেদ ওই অপকর্মটি করেছিলেন এবং দৈনিক ইত্তেফাক ফলাও করে সেটি ছেপেছিলও। পরে দৈনিক দেশ পত্রিকার রিপোর্টার ছিলেন ওবায়দুল হক। তিনি ওই ঘটনার ওপর ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট করেছিলেন, এটি ছিল বানোয়াট এবং ১০ টাকা দিয়ে বাসন্তীকে জাল পরিয়ে এই ছবি তোলা হয়েছিল। আমি এ ব্যাপারে ফটোগ্রাফার আফতাব আহমেদকে প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ওই ছবি ছাপা হওয়ার পর দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য অনেক বেশি রিলিফ এসেছিল। এসময় রিপোর্টার আবেদ খানের ওপেন সিক্রেট ধারাবাহিকটিও পাঠকমনে প্রশ্নের উদ্রেক করেছিল।
আরেকটি কথা, বাকশাল করার পর চারটি ছাড়া অন্য কাগজে প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। চারটির মধ্যে ইত্তেফাক ছিল। তবে বন্ধ হওয়া দৈনিক বাংলা থেকে সব সাংবাদিক গিয়ে ইত্তেফাক দখল করে। আমাদের বসার জায়গাও ছিল না। আবেদ খান ও আমাকে পূর্বাণীতে অ্যাবজরভ করার জন্য ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কাকরাইল চেম্বারে যাই। তিনি আমাদের বললেন, আপনাদের পূর্বাণীতে যেতে হবে না। আপনারা আপনাদের ইত্তেফাকেই থাকবেন। ঠিক তার এক সপ্তাহ পরেই ১৫ আগস্ট ঘটেছিল।

চৌদ্দ.
এই ঘটনাবলির সবই ছিল আগস্ট ট্র্যাজেডি ঘটানোর পরিবেশ সৃষ্টিতে কিসিঞ্জারি চক্রান্ত। আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে কোনো ব্যক্তির শয়তানিকে মানুষ কিসিঞ্জারির চক্রান্ত বলত। কেন, ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বেছে নিয়েছিল তার প্রধান কারণ ছিল।
১. বাকশাল দেশব্যাপী কাজ শুরু করলে হত্যার পরিবেশ থাকবে না
২.দুর্ভিক্ষের পর বঙ্গবন্ধু সরকারের বিনামূল্যে সার, বীজ, সেচ পাম্প গভীর নলকূপ সরবরাহ করায় কৃষিতে বাম্পার ফলন এবং চালের কেজি দুর্ভিক্ষের সময় ৮ টাকা থেকে সাড়ে তিন টাকায় নেমে আসে।
৩. বঙ্গবন্ধুর কেনা চাউলের জাহাজও হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশে আসে।
এভাবে বঙ্গবন্ধুর দুর্ভিক্ষ-উত্তর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল মোশতাক-জিয়া পায়। ততদিনে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন সম্পন্ন হয়। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর চীন, সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। কিসিঞ্জারি চক্রান্তের আর কোনো উদাহরণ দেওয়ার দরকার আছে বলে মনে করি না।
এভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য একটা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। যদিও বঙ্গবন্ধু সহজে এর মোকাবিলা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাসই করতেন না কোনো বঙ্গসন্তান তাঁকে হত্যা করতে পারে। কিসিঞ্জারি শয়তানরা হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। কিসিঞ্জারি শয়তানদের বিচার আজও হয়নি। হত্যাকাণ্ডের পর জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনেকের চেহারাও আমরা দেখেছি। শয়তানরা আজও চক্রান্ত করে যাচ্ছে। তাই তো দাবি উঠেছে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের।

৭ই আগস্ট ২০২১
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *