আমলাতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র

 আমলাতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক প্রয়াত মিজানুর রহমান খান রাজনীতিবিদ ও আমলাদের নিয়ে প্রচুর লিখেছেন। এতে সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়েছে রাষ্ট্রপরিচালনায় আমলা দরকার; আমলা ভালো কিন্তু আমলাতন্ত্র ভালো নয়। গুরুত্ব বিবেচনায় লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ লিখেছিলেন, `ব্যুরোক্রেসি বড় ক্রেজি দেখাতে চায় ডাট/ভিতরটা তার খড়ে ঠাসা বাইরে বেজায় ঠাট।’আমলাদের সম্পর্কে কবির এই রসিকতা শুধু বাংলাদেশী আমলাদের জন্য প্রযোজ্য কি-না তা বলা মুশকিল। তবে সমালোচকরা বলে থাকেন, আমাদের আমলাতন্ত্রের মান উপমহাদেশের সকল দেশের আমলাতন্ত্রের অনেক নিচে। চলনে-বলনে, পোশাকে, ঠাটে-বাঁটে এরা অতিশয় কেতাদুরস্ত- বিশেষ করে যারা উপর মহলে আছেন- আছেন ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের সঙ্গে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই ‘বড় ক্রেজি’ কথাটা বোধ হয় অত্যুক্তি নয়। অবশ্য এ কথা স্মরণে এনে তাবৎ আমলাদের ওপর অথবা যেসব আমলা অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা সহ্য করেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে দেশের কল্যাণে কোনো-না-কোনোভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন তাদের আমরা খাটো করতে চাই না। অনেক আমলাই আছেন, যারা সুযোগ পেলে ক্ষমতা প্রদর্শনে শুধু এ উপমহাদেশে কেন ইউরোপের আমলাতন্ত্রের সঙ্গেও পাল্লা দিতে পারেন। কিন্তু সে সুযোগ তাদেরকে তৈরি করে দেওয়া হয়নি। সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে পাবলিক সার্ভিস কমিশন অব্যাহতভাবে তার দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সত্ত্বেও গুণগত পরিবর্তন প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভের সংসদ, বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে শেষোক্ত বিভাগকেই কার্যত নিয়ন্ত্রণ করেন আমলারা। সম্প্রতি রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করায় আমলাদের ভূমিকার বিষয়টি আবার নতুন করে সামনে এসেছে। আমরা বহুবার আমলাদের জবাবদিহিতার ওপর আলো ফেলবার চেষ্টা করেছি। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ক্ষমতা থেকে পতনের পর মন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়ে অন্তত হইচই হয়েছে। মন্ত্রীদের সাজাপ্রাপ্তির নজির কম বটে, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। শোরগোল হয়েছে। কিন্তু কোন সচিবকে নিয়ে কখনোই টু-শব্দটি হয় না কেন? একটি মন্ত্রণালয়ের তাবৎ দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির সঙ্গে একজন মন্ত্রীই কি জড়িত থাকেন? জনমনে এ নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠছে। দুর্নীতির মামলায় মন্ত্রী জড়িয়ে পড়লে সচিবের দায়িত্ব কি শুধু এই যে, তিনি আসলে চাপের মুখে দায়িত্ব পালন করেছেন? তার পক্ষে অন্যথা কিছু করার উপায় ছিল না?
১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দের অভাবনীয় আমলা বিদ্রোহ কিন্তু একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ডক্টর মহীউদ্দিন খান আলমগীররা যে তত্ত্ব দিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, তার মূল কথা ছিল সরকার কোনো অবৈধ নির্দেশ দিলে সরকারি কর্মচারীরা তা মেনে চলতে বাধ্য নয়। কারণ তারা কোনো দলীয় সরকারের নয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। এই থিওরি শুধু বিএনপির নির্বাচিত সরকারকে টেনেহিঁচড়ে গদি থেকে নামানোর জন্য প্রণয়ন করা হয়েছিল কি-না সেই প্রশ্নের জবাব আগামী দিনগুলোতে পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু নয়া রুলস অব বিজনেস আমলাদের কর্তৃত্ব ও খবরদারি হ্রাস করেছে- বিশেষজ্ঞরা এমন দাবি এখনো পর্যন্ত করছেন না। মন্ত্রণালয়ের প্রিন্সিপাল অ্যাকাউন্টিং অফিসার হিসেবে আগের মতোই আছেন সচিবরা। মনে করা হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষমতাকে আরো নিরঙ্কুশ করেছেন। এরশাদীয় মডেলের সঙ্গে এর মিল অনেক। মন্ত্রীদের নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী করা হলেও, বলা হয়েছে যে, মন্ত্রীরা এখন থেকে মন্ত্রিসভার মাধ্যমে সংসদের কাছে জবাবদিহি না করে সরাসরি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে করবেন। কিন্তু সংবিধানে লেখা আছে মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়ী থাকবে। নতুন নিয়মে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর গোচর বা সম্মতি ছাড়াই যে কোন মন্ত্রণালয়ের যে কোন লেভেল থেকে যে কোন ফাইল তলব করতে পারবে। এর ফলে কার্যত এক সুপার সেক্রেটারিয়েট-এর অভ্যুদয় ঘটবে। কারণ আমলাতন্ত্র এর ফলে উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে এক অলিখিত আঁতাত গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
টেলিভিশনের প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, তিনি প্রশাসনকে রাজনীতিমুক্ত করেছেন। সমালোচকরা এ দাবি মানতে নারাজ। তারা বলেন, জনতার মঞ্চপন্থী আমলারা কে কোথায়- তার একটা পরিসংখ্যান নিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সৌদি গেজেটকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, উর্দ্ধতন আমলারা শেখ হাসিনাকে বলেছেন, দলীয় সমর্থক ঢুকিয়ে সুপার মিনিস্ট্রি গঠন করবেন না। এই তথ্য সত্য হলে নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে প্রধানমন্ত্রীর সেক্রেটারিয়েটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন অনেক আমলার ঠাঁই হয়েছে যাদের দেখে অনেকেই চিন্তিত। জনতার মঞ্চের রূপকারদের অনেককে এখানে এনে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এরাই ইতোমধ্যে বলছেন, আলামত সুবিধার ঠেকছে না। এমন সব লোককে চাকরিতে পুনর্বাসিত করা হচ্ছে যা অবাঞ্ছিত। শুধু দলীয় সার্টিফিকেটের জোরে রাতারাতি এরা জুড়ে বসছেন।
অনেকে স্মরণ করছেন, আওয়ামী লীগের গোড়ার শাসনের ইতিহাস। সেক্টর কমান্ডারদের পরিবর্তে ডেপুটি কমিশনারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচনের। সেই অনুযায়ী দেয়া হয়েছিল সনদ। সেই সর্বনাশের মাশুল আজও দিতে হচ্ছে। কি প্রশাসন, কি রাজনীতি- সর্বত্র অনুসন্ধান, কে আসল কে নকল। তাই আমরা দেখি ইয়াহিয়ার ট্রাইব্যুনালের কথিত চেয়ারম্যান জেনারেল এরশাদকে ‘মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা’ কি অবহেলায় ‘রণবীর’ খেতাবে ভূষিত করেন।
আমাদের মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান আমলের ২৫ বছর মূলত শাসন করেছে আমলারা। সুতরাং ঔপনিবেশিক লিগেসি শুধু নয়, পাকিস্তানি ২৫ বছরও ছিল কোটারি আমলা শাসন। যাদের সার্বিক লক্ষ্যই ছিল, জনপ্রতিনিধিদেরকে হেনস্তা করা। রাজনীতিকরা যে ব্যবস্থাপনায় অথর্ব, ব্যর্থ সেটা প্রমাণ করা। শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রক্রিয়ার অন্যতম ভুক্তভোগী। কিন্তু তিনিও অন্তিমে আমলাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। তাঁর ভগ্নিপতি তৎকালীন আমলা কুলের অন্যতম শিরোমণি সৈয়দ হোসেন (ইপিসিএস ক্যাডারের) হওয়া সত্ত্বেও বিপদে কাজে আসেননি।
জেনারেল এরশাদের ছিল ভিন্ন লাইন। সামরিক আমলাদের নিয়ে বেসামরিক আমলাদের কব্জায় রাখা। সামনে থাকবে পয়সা দিয়ে কেনা রাজনীতিবিদ, যাদের প্রয়োজনে বলি দেওয়া যাবে আর পিছনে থাকবে সামরিক প্রশাসন। এর অধঃস্তন সহযোগী থাকবে সিভিল ব্যুরোক্রেসি। এ কারণে তিনি সামরিক- বেসামরিক আমলাদের লুটপাটের সুযোগ করে দেন। এর পরিণতিতে আবদুল গণি রোডের সেক্রেটারিয়েট শুধু নয়, গোটা আমলাতন্ত্রও পচে গেল। উচ্চপদস্থ আমলাদের প্রতি জনগণের যে অশ্রদ্ধা তা অতীতে কিন্তু ছিল না। এরশাদ জামানার আরেক প্রবণতা- আমলা থেকে মন্ত্রী হওয়া। একজন আমলা-টার্নড-পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন লেখেন, ‘রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে এবং গতিশীল ও নিপুণ প্রশাসন গড়ে তুলতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত’, তখন আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিবিদদের আঁতাতটা কোন্ পর্যায়ে নেমে গেছে তা আন্দাজ করা যায়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রায়নে প্রধান প্রতিবন্ধক ছিল সামরিক আমলাদের প্রভাব ও তাদের সাথে বেসামরিক আমলাদের সহযোগিতা। বর্তমানে প্রচলিত ’ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ অনুসারে একজন সচিব ও মেজর জেনারেলের পদ সমান, সেনাপ্রধান ও মন্ত্রিসভার সচিবের মর্যাদা নির্বাচিত একজন এমপির ওপর। আওয়ামী লীগ দাবি জানিয়েছিল এই ব্যবস্থা বদলের। বিএনপি রাজি হয়নি। আওয়ামী লীগ এবার তা করে দেখাবে এটাই প্রত্যাশিত।
রাজনীতি যদি নীতিকেন্দ্রিক না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়, তবে ব্যুরোক্রেসি সুষু্ঠু পথে বিকশিত হতে পারে না। সে সুযোগ পেলেই দল-তোষণ করবে, যেমন একজন জনপ্রতিনিধি অনুরূপ অবস্থায় সারাক্ষণ নীতির পরিবর্তে নেতা-নেত্রী তোষণে ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু উচিত হল, রাজনীতির সঙ্গে যারা যুক্ত তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কার্যের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন, সামরিক-বেসামরিক আমলারা নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখবেন নিজ নিজ দায়িত্বের পরিধিতে।
এই দায়িত্বের পরিধি সম্পর্কে সচেতন থাকার প্রথম দায়িত্ব আমলাদেরই। আমলাতন্ত্রের সঙ্ঘবদ্ধ রাষ্ট্রবাদ কি ফ্যাসিবাদের চাইতে ভয়ঙ্কর?- এমন প্রশ্ন কিন্তু ইতোমধ্যেই উঠেছে। দেশের লোকবল, সম্পদ, সম্ভাবনা ও বৈদেশিক সম্পর্ক সংগঠিত ও পরিচালনা করা আমলাতন্ত্রের মূল কাজ। দেশ ও সমাজের অব্যাহত উন্নতিই তার লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমলাতন্ত্রকে আমরা আলাদা কোনো তন্ত্রের দেখতে চাই না। গণতন্ত্র তা সমর্থন করে না। আগেই বলেছি, আমলাতন্ত্রের ভয়াল নজির পাকিস্তানের ২৫ বছর। যার অন্যতম প্রতিভূ গোলাম মোহাম্মদ। আমরা বাংলাদেশে আর একজন গোলাম মোহাম্মদ দেখতে চাই না।
প্রকল্প ও কার্যক্রম আজও যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয় না। আমলাতন্ত্রের যাঁতাকলে পিছিয়ে পড়ে। এতে ব্যয় ৩৫ হতে ৪০ ভাগ বেড়ে যায়। আর ক্রমাগত তাগিদ না দিলে, আমলাতন্ত্র প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় ৬০ ভাগ বাড়িয়ে ফেলে। এসব অবসানে রাজনীতিজ্ঞদের উপযুক্ত নীতি নির্দেশ করতে হবে। সারা পৃথিবীর নিয়ম এটাই। রাজনীতিকরা নিয়ম না মানলে রুলস দেখাতে হবে অকপটে। মন্ত্রীর কোন একটি অন্যায় অনুরোধ উৎসাহের সঙ্গে বা উৎসাহ চেপে বাস্তবায়নের পরে ওই মন্ত্রীকে দিয়ে আমলারা নিজেদের দশটি তদ্ববিরের কাজ করিয়ে নেয়। এই দুই পচনের প্রক্রিয়া যত তাড়াতাড়ি রহিত হয় ততই মঙ্গল।
নভেম্বর ১৯৯৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *