আমার হৃদয়ে তিনি নিত্য জাগ্রত

 আমার হৃদয়ে তিনি নিত্য জাগ্রত

নূরে আলম সিদ্দিকী

আগস্ট মাসটি বাঙালি জাতির তথা বাংলাদেশের জন্য শোকের মাস। কিন্তু আমার জন্য এটি হৃদয়ে রক্তক্ষরণের মাস; অনুভূতি, উপলদ্ধি ও মননশীলতার পরতে পরতে অসহ্য ও তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা বহন করার মাস। ৪৬ বছর হয়ে গেল মুজিব ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু আমার অনুভূতিতে, বিশ্বাসে এটা আজও পুরোপুরি সত্যরূপে প্রতিভাত হয় না। আমার মননশীলতা, অনুভূতি, হৃদয়ের অনুরণন, কোনো জায়গায় বঙ্গবন্ধু নেই বা তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন- এটা মানতে পারে না। আমার স্বপ্নের মধ্যে তো বটেই, জাগরণেও তাঁর উপস্থিতি স্পষ্টভাবে উপলদ্ধি করি। এ অনুভূতি কাউকে বোঝানো যাবে না, বোঝানো যায় না। আমার হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে তিনি অমলিন। তাঁর সঙ্গে সমস্ত স্মৃতি আমার হৃদয়ে নিত্য জাগ্রত। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকার ঘোষিত মুজিব বর্ষ চলছে। শোকাবহ আগস্টে আমার প্রাণের মুজিব ভাইয়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। ১৫ আগস্টের সেই নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে নিহত বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণের অধিকার অর্জনের সফলতা ছাড়াও ৭০-এর গণম্যান্ডেট ও তার উপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগ ও চেতনায় সূর্যস্নাত আমাদের এ স্বাধীনতায় বিশাল জনগোষ্ঠীর অংশীদারিত্ব একটি অবিস্মরণীয় ও অভূতপূর্ব অর্জন। এই অর্জনে বাংলার তরুণ তাজা তপ্তপ্রাণ নেতৃত্বের সিংহাসনে বসিয়েছিল এদেশের রাজনীতির অতি সাধারণ স্তর থেকে উঠে আসা বাংলার মুকুটহীন সম্রাট, মানুষের হৃদয়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত শেখ মুজিবকে। তিনি বাংলার মানুষকে বিশ্বাস করতেন অকপটে এবং তার হৃদয়ের দুয়ার শুধু অবারিতই নয়, তিনি গণভবনে যাননি সাধারণ মানুষের জন্য গণভবনের লৌহকপাট সর্বদা উন্মুক্ত ও অবারিত রাখা সম্ভব নয় বলে।
ব্যক্তিগতভাবে আমি এবং অনেকেই সম্পূর্ণ নিরাপত্তা-বর্জিত ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে তাঁর নিজস্ব বাড়ি থেকে তাঁকে স্থানান্তরের জন্য অনেক অনুরোধ-উপরোধ কাকুতি-মিনতি করে ব্যর্থ হওয়ার পরও অন্তত রাত্রিযাপনের জন্য হলেও গণভবনে অবস্থানের জন্য কী পীড়াপীড়ি ও অনুরোধই না করেছি। এ প্রশ্নে শুধু উপেক্ষাই নয়, অনেক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপও তিনি করেছেন, টীকা-টিপ্পনিও কেটেছেন। সবকিছু সহ্য করেও আমরা অনুরোধ ও চাপ সৃষ্টির প্রাণান্ত প্রচেষ্টা থেকে সরে আসিনি। আমাদের অনুরোধ-উপরোধ যখন কার্যকর হলো না, তখনও নাছোড়বান্দার মতো আমরা তাঁর রাত্রিযাপনের স্থানটির নিরাপত্তা অনেক গুণ বৃদ্ধির উপর জোর দিয়েছি। আজকের প্রজন্ম বিস্ময়াভিভূত ও আশ্চর্যান্বিত হবেন, তিনি অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সঙ্গে নিরাপত্তার সেই প্রস্তাবগুলি উপেক্ষা করে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে প্রায়শই বলতেন- ‘দরদ দেখাও মিয়ারা? আমি জানি তোমাদের উদ্বিগ্নতার কারণ। কিন্তু তোমরা যেটা জানো সেটা আমার উদাসীনতা নয়, বাংলার মানুষের প্রতি আমার অকুণ্ঠ বিশ্বাস। আমার প্রতি বাংলার মানুষের ভালোবাসা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সকলেই মর্মে মর্মে উপলদ্ধি করত বলেই আমাকে বাংলাদেশের কোন কারাগার তো দূরে থাক, ক্যান্টনমেন্টেও রাখতে সাহস পায়নি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু হওয়ার পর তারা আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে সরিয়ে নিয়ে সেনানিবাসে অবরুদ্ধ করে, কিন্তু তাতেও কি তাদের শেষরক্ষা হয়েছিল?’ এ প্রশ্নে আমরা নিরুত্তর থাকলেও পরিপূর্ণ আশ্বস্ত হতে পারতাম না, মনকেও প্রবোধ দিতে পারতাম না। প্রতিনিয়তই আমাদের আন্তরিক অনুরোধকে বিদ্রুপ করে তিনি বলতেন- আমি না বলেছি, I love my people. আমাকে ধমক দিয়ে বলতেন, ডেভিড ফ্রস্টের কাছে আমি যখন বললাম, আমার চরিত্রের সবচেয়ে দুর্বল দিক হলো, I love my people too much. তুমি কি মনে কর, এটি চটকদার রাজনৈতিক একটি কথার কথা ছিল? হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাত ধরে কর্মী থেকে নেতা এবং জনগণের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছি। এই কারণে আমি যা বলি সেটা বিশ্বাস করি। আর যেটা বিশ্বাস করি না, সেটা কখনো বলি না। প্রচণ্ড অস্বস্তি এবং দিগন্তবিস্তৃত আকাশের কালো মেঘের মতো একটা অজানা আশঙ্কা ও আতঙ্ক নিয়ে সেদিনের মতো নিশ্চুপ হয়ে যেতাম।
মুজিব ভাইয়ের নেতৃত্বের যে আসন, সেটি মানুষের হৃদয়ে তিলতিল করে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। সে আসনটি ছিল মোঘলদের হীরকখচিত ময়ুর সিংহাসনের চেয়েও মূল্যবান, অতুলনীয়। তাইতো প্রশ্ন এসে যায়, ১৫ আগস্টের পর সারা বাংলাদেশ আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো বিস্ফোরিত তো হলই না, বরং নীরব, নিথর, নিস্পৃহ, নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে রইল কেন? এই নিস্পৃহতার কী কারণ- তার পূর্ণ বিশ্লেষণের ভার আমি ইতিহাসের কাছেই অর্পণ করতে চাই। তবুও আমার নিজের ধারণা, ঘটনার আকস্মিকতা এবং নৃশংস নির্মমতায় সমগ্র জাতি হতচকিত হয়ে গিয়েছিল, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত- বাকশাল গঠন প্রক্রিয়ার প্রকোপে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তি বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। অনেক দল, বিশেষ করে ভ্রান্ত বামের সংমিশ্রণে আওয়ামী লীগ তার নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ভাগের মা গঙ্গা পায় না- এমনই এক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল সে সময়। অন্যদিকে, যাদের উপর সংগঠনসমূহের দায়িত্ব অর্পিত ছিল তারা সকলেই দায়িত্ব পালনে কেবল ব্যর্থই হননি, অনেকটা অস্বীকৃতি জানানোর মতোই ছিল তাদের নিস্পৃহতা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, রক্ষীবাহিনী রাজনৈতিক নির্দেশের অভাবে সেনাবাহিনী থেকে পরিত্যক্ত ২৬ জন ধিকৃত ঘাতককে প্রতিরোধ করার জন্য এগিয়ে আসেনি।
বঙ্গবন্ধুকে অকালে হারানোয় ক্ষতবিক্ষত আমার হৃদয়কে দীপ্তিহীন আগুনের শিখায় দগ্ধীভূত করে যখন একান্তে ভাবি, বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের গৃহটি আক্রান্ত হওয়ার পর দুই ঘণ্টার কাছাকাছি সময় তিনি হাতে পেয়েছিলেন। এই সময়ের মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে এবং রক্ষীবাহিনীর যিনি রাজনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন- তাদের সবার সঙ্গে টেলিফোনে বারবার পরিস্থিতি জানিয়ে সাহায্যের জন্য, অর্থাৎ ওদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু বারবার টেলিফোন করার পরও কারো কাছ থেকে তিনি কোন সহযোগিতা পাননি, শুধুমাত্র কর্নেল জামিল ব্যতিরেকে। আমি প্রত্যয়দৃঢ় চিত্তে মনে করি, সশস্ত্রবাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে তো বটেই, ন্যূনতমভাবে তাদের দেহরক্ষীদের নিয়ে বের হলেও দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করার পথ খুঁজে পেত না। কিন্তু দুর্ভাগ্য বঙ্গবন্ধুর, মর্মান্তিক শাহাদাতের আগে তিনি বুকভরা বেদনা নিয়ে উপলদ্ধি করে গেলেন, তিনি কতটা একা, নিঃস্ব ও রিক্ত !
বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে, কিন্তু দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর ডাকে যারা সাড়া দেননি, নিস্ক্রিয়, নিস্পৃহ ও নিস্তব্ধ থেকেছেন, তাদের শনাক্ত করে আওয়ামী লীগের মতো সংগঠন থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ তো দূরে থাক, তাদের চিহ্নিত করে প্রতিবাদ ও জবাবদিহিতা পর্যন্ত চাওয়া হয়নি। বারবার সাহায্য চেয়েও নিষ্ফল হয়ে একাকীত্ব ও অসহায়ত্বের বেদনা নিয়ে বঙ্গবন্ধু মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আজও সেই গ্লানি থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। যারা নিষ্কলুষ চিত্তে বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, তারা আজও কান পাতলে হয়তো ইথারে তাঁর বিদেহী আত্মার এই বেদনার ধ্বনি শুনতে পান।
১৫ আগস্ট সম্পর্কে ভাবতে বা লিখতে গেলে একটি প্রশ্ন আমার সামনে এসে যায়। প্রশ্নটি ব্যক্তিগত হলেও শাশ্বত এবং ঐতিহাসিক। সেটি হলো- ১৫ আগস্টের পর স্বাধীনতা আন্দোলনের মতো কেন দৃঢ় পদক্ষেপ নিইনি? কেনই-বা একটা শক্ত ও ফলপ্রসূ প্রতিবাদ গড়ে তুলিনি বা তুলতে পারিনি। আমি আজ জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে সম্প্রতি ফিরে এসেছি। তাই বিবেকের তাড়নায় জীবনসায়াহ্নে এসে এই প্রশ্নগুলোর যথোপযুক্ত উত্তর দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং মুজিব ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কের নিবিড়তা, গভীর সম্পৃক্ততা এবং তাঁর হৃদয়ের উত্তাপে প্রজ্জ্বলিত সত্তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে বহুল আলোচিত প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার যথাযথ বাস্তবসম্মত ও সত্যের ধারায় উত্তর প্রদান করা। আমি পূর্বাপর অনেকবার বলেছি, আজও বলতে চাই, তখন রাজনৈতিক কোন সংগঠনের দায়িত্ব আমার ছিল না। হৃদয়ের নিভৃত কন্দরে নিভু-নিভু আলোর বাতিটুকু ছাড়া আমি ছিলাম রাজনৈতিক দায়িত্ব বিবর্জিত রিক্ত এবং হৃদয়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জর্জরিত একটি রাজনৈতিক সত্তা মাত্র। স্বাধীনতা-যুদ্ধ সংগঠনের কালে এবং যুদ্ধ চলার সময়ে আমি স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় উজ্জীবিত ছাত্রলীগের মতো বিশাল বিস্তীর্ণ সংগঠনের সভাপতি ছিলাম। বাংলার হাটে ঘাটে মাঠে হ্যামিলনের বাঁশি হাতে নিয়ে পাগলের মতো দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতাম। শয়নে স্বপনে জাগরণে আর মননের মনিকোঠায় স্বাধীনতার অগ্নিকণায় সূর্যস্নাত হওয়ার বাসনা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আর সেই বাসনাকে পরিপূর্ণ করার শানিত অস্ত্র ছিল আমার হাতে। সেটি কালজয়ী সংগঠন ছাত্রলীগ। আর ১৫ আগস্টে আমি অস্ত্র-বিবর্জিত পর্যুদস্ত, অনেকটা পরাভূত একটা বিষণ্ণ সৈনিক। আমার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সাংগঠনিক শক্তি-বিবর্জিত বিপর্যস্ত রণক্লান্ত সৈনিকের পক্ষে পরিতাপ করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না। যুদ্ধজয় তো সম্ভবই না।
যেটি আমার পক্ষে ১৯৭১ সালে সম্ভব ছিল, ১৯৭৫ সালে সেটি আদৌ সম্ভব ছিল না। কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন করা তো আমার পক্ষে স্বাভাবিক, যাদের হাতে সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল, যারা বঙ্গবন্ধুর সন্নিকটে বা সান্নিধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন, ১৫ আগস্টের পর কেন তারা নীরব, নিশ্চুপ, নিথর হয়ে ছিলেন? সারা বাংলাদেশের কোথাও কোন প্রতিরোধ তো দূরে থাক, প্রতিবাদটুকুও তারা গড়ে তুলতে পারেননি। তাদের এই নিস্পৃহতার জবাব কেন তারা দেবেন না? প্রায় চার যুগ অতিবাহিত হতে চলেছে, কিন্তু তাদের কাউকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। কিন্তু আমাকে রাজনৈতিক অঙ্গন হতে, এমনকি যুবলীগের মহাসচিবের পদ হতে ষড়যন্ত্রের কষাঘাতে জর্জরিত করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার অবস্থা তখন- ঢাল নাই তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দারের মতো।
১৫ আগস্টের কিছুদিন আগেও আমি যুবলীগের মহাসচিব ছিলাম। সেখান থেকেও আমাকে সুকৌশলে সরিয়ে দিলে (মনি ভাই এর বিপক্ষে ছিলেন) আমি শুধু নিস্ক্রিয় ও নিস্তব্ধই হয়ে যাইনি, হয়তো ওই প্রতাপশালী অংশের কেউ আমাকে রক্ষীবাহিনী অথবা আততায়ী দিয়ে হত্যা করিয়ে তারা নিজেরাই শোকসভা, প্রতিবাদ সভা ও মিছিল করতেন। আমার সুহৃদ, শুভাকাঙ্ক্ষীদের এমন হুঁশিয়ারির পরিপ্রেক্ষিতে আমি আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হই। সকল ধরনের সংগঠন থেকেই আমাকে বিযুক্ত করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর আমি ওইদিন ভোরে আমার পিতার টেলিফোনের মাধ্যমে জানতে পারি। আমি যে বন্ধুর বাসায় থাকতাম, তার টেলিফোন নম্বর কেবলমাত্র আমার পরিবারের সদস্যদেরই জানা ছিল। খবরটি শুনে পিঞ্জরাবদ্ধ বাঘের মতো বন্ধুর বাসায় ছটফট করছিলাম। মানসিক অবস্থা এমন ছিল যে, মন চাইছিল চিৎকার করে একাকী রাস্তায় বের হয়ে একাই প্রতিবাদ করতে থাকি। আমার বন্ধু ও তার স্ত্রী আমাকে নিবৃত্ত করার জন্য নানা ধরনের সান্ত্বনা ও প্রবোধ বাণী শোনাচ্ছিলেন। তাদের মূল কথা ছিল, ধৈর্য ধর, পরিস্থিতি পর্যালোচনা কর, বিশ্বস্তদের সঙ্গে যোগাযোগ কর। যাদের সঙ্গেই যোগাযোগ করেছি, তারাই আমাকে ধৈর্যধারণ ও শান্ত থাকতে বলেছেন। অকস্মাৎ এমন কিছু যেন না করে বসি যেটি আত্মঘাতী ও অনর্থক বিপদসংকূল পরিস্থিতিতে আমাকে ঠেলে দেবে। জীবনে আমি আর কখনো এতটা অসহায়বোধ করিনি।
স্বাধীনতার পূর্বকাল হতেই ভ্রান্তবামেরা বঙ্গবন্ধুকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে আসছিল। বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে তাদের সেই চেষ্টা সফল হয় এবং যত কষ্টদায়কই হোক এটা নির্মম বাস্তব, বাকশাল গঠন ১৫ আগস্টের পটভূমিকা রচনায় অনেকটাই প্রণোদনা প্রদান করে। নেতা অবশ্য আমাকে ডেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, আমি আমার মানুষকে বলেছিলাম, সাড়ে তিন বছর কিছুই দিতে পারব না। তারা তা বিনা প্রতিবাদে মেনে নিয়েছে। এখন আমি কী করে তাদের শান্ত রাখব? তাই এখন একটা রেজিমেন্টেশনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান একটা উন্নয়ন আনতে চাই। তারপর আবার বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসব, ইনশাল্লাহ। কিন্তু ১৫ আগস্ট তাঁর সেই ওয়াদা পুরণ করার সুযোগ দেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *