কেন কমছে না টাকা পাচার

 কেন কমছে না টাকা পাচার

বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে ফাঁকি দিয়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা পাচার হচ্ছে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে। দেশ থেকে এসব অর্থ যাচ্ছে পৃথিবীর ৩০-এর অধিক দেশে। সবচেয়ে বেশি যাচ্ছে ১০ দেশে। যার বড় অংশই জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে। এ ছাড়া অর্থ পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এসব অর্থ পাচারের কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এর মধ্যে রয়েছে- বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং বেপরোয়া দুর্নীতি। দেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে বহু পদক্ষেপ নেয়া হলেও এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

এ হিসাবে গড়ে প্রতিবছর পাচার হচ্ছে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় টাকা পাচার বেড়েছে। এ ছাড়া দুর্নীতিও টাকা পাচারের অন্যতম কারণ। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন, দেশ থেকে প্রতিবছর যে পরিমাণ টাকা পাচার হয়, তার আংশিক তথ্যই প্রকাশ পায়। এ অবস্থায় বিস্তারিত তথ্য খুঁজে বের করে অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া না হলে পাচার কমবে না। একইসঙ্গে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ছাড়া অর্থ পাচার রোধে আইনে তদন্তকারী সংস্থাগুলোকে যতই ক্ষমতা দেয়া হোক, তারা যদি কাজে দক্ষতার পরিচয় দিতে না পারে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না।

অভিযোগ রয়েছে, টাকা পাচারের বিষয়ে সরকার অবহিত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না; কারণ প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালীদের অনেকেই অর্থ পাচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তবে অর্থ পাচার প্রক্রিয়ায় কেবল রাজনীতিক নন; দেশের অনেক ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও জড়িত, যারা নীতি-নৈতিকতা ও দেশপ্রেম ভুলে বিদেশে অর্থ পাচার করছেন।

এ প্রবণতা বন্ধ না হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারের কারণে এসডিজির সফল বাস্তবায়ন ও অন্যান্য লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে এবং দুর্নীতি কমলে বিদেশে অর্থ পাচার হ্রাস পাবে। কাজেই অর্থ পাচার রোধে দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির পাশাপাশি দুর্নীতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, পাচারের অর্থের সংখ্যাটি বড়। এসব অর্থের উৎস মূলত দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়। তবে পাচারের ক্ষেত্রে দেশের সার্বিক অবস্থা বিশেষ করে নিজের নিরাপত্তা, পরবর্তী প্রজন্মের নিরাপত্তা, সম্পদের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যখন কেউ মনে করেন, এসব নিরাপত্তা নেই কিংবা থাকলেও ভবিষ্যতে না থাকার অনিশ্চয়তা থাকে, তখন অনেকে বিদেশে অর্থ পাচার করে। আহসান মনসুর বলেন, আমলা, ব্যবসায়ী প্রায় সবার ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকে। সন্তানদের নিরাপদ ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তারা টাকা সরানোর চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে এ দেশে বিনিয়োগ বা টাকা রাখায় আস্থা নেই। অনেকে বাড়ি বিক্রি করছে, সম্পদ বিক্রি করে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে টাকা সরানো এখন কঠিন কিছু নয়।

গত ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বের অন্যান্য দেশের তথ্য প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। কিন্তু ২০১৫ সালের তথ্য দিয়ে বাংলাদেশের রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। কারণ এ সময়ের পর জাতিসংঘকে বৈদেশিক বাণিজ্যের কোনো তথ্য দেয়নি বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ৫টি কারণ তুলে ধরেন আহসান এইচ মনসুর বলেন, বিনিয়োগের পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার শঙ্কা, রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর দুর্বল নজরদারি, আইনের শাসনের ঘাটতি এবং বেপরোয়া দুর্নীতির কারণে দেশের টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগে অর্থ পাচার কমছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশ থেকে যে টাকা বাইরে চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। সুতরাং কালো টাকা সাদা করার সঙ্গে অর্থ পাচার কম হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে টাকা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেবে। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান মাসুদ বিশ্বাস।

বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা জিএম কাদের বলেছেন, যারা বারবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি বলেই এখনো সমাজের প্রতিটি স্তরে শোষণ ও বৈষম্য। এখনো শোষণ চলছে, প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। দেশের টাকা পাচার করে বেগম পাড়া তৈরি হচ্ছে। আগামী প্রজন্মের জন্য শোষণ ও বৈষম্যহীন একটি দেশ গড়তেই আমাদের রাজনীতি।

২৭শে নভেম্বর সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে দেশ থেকে অর্থ পাচার কারা করে জানেন না জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, অনেকে বলছেন দেশ থেকে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। আমি আপনাদের বলছি, যারা পাচার করে তাদের তালিকা আমাকে দিন। আমি তো পাচার করি না। আমি বিশ্বাস করি আপনারাও পাচার করেন না। সুতরাং পাচার কে করে তা আমি জানবো কেমন করে, যদি আপনারা না দেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পাচার হওয়া অর্থের একটি আংশিক চিত্র দিয়েছে জিএফআই। প্রতিবছরই নানা কায়দায় অর্থ পাচার বাড়ছে। যারা অর্থ পাচার করছেন, তারা আর্থিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিকভাবে অনেক প্রভাবশালী। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সদিচ্ছার ঘাটতি, স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার ঘাটতি অর্থ পাচার প্রতিরোধে ব্যর্থতার অন্যতম কারণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *