জাওয়াদে বিপর্যস্ত দক্ষিণাঞ্চল, আজ কমতে পারে বৃষ্টি

 জাওয়াদে বিপর্যস্ত দক্ষিণাঞ্চল, আজ কমতে পারে বৃষ্টি

ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদের প্রভাবে গত রবিবার রাত থেকে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টি হয়েছে। খুলনার কয়রায় বেড়িবাঁধ ভেঙে দুটি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফসলের মাঠে পানি জমেছে। এতে ধান, আলু, লবণসহ রবিশস্যের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

দিনভর টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে। উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলেই কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো মুষলধারে বৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যাওয়ায় যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে সকালে অফিসগামী মানুষকে পড়তে হয় চরম ভোগান্তিতে। এ ছাড়া এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতেও বেগ পেতে হয়। অনেকেই ভেজা কাপড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢোকে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ গতকাল সন্ধ্যায় লঘুচাপে পরিণত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার এটি আরো দুর্বল হয়ে হয়ে যেতে পারে। ফলে খুব বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। উপকূলীয় এলাকাসহ কিছু এলাকায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকতে পারে। তবে কাল বুধবার থেকে সারা দেশের পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

আবহাওয়া অফিস জানায়, সাগর উত্তাল থাকায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। গতকাল সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে যশোরে, ১৬৩ মিলিমিটার। ঢাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ছিল ১৩২ মিলিমিটার।

বাঁধ ভেঙে দুই গ্রাম প্লাবিত

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হরিহরপুর গ্রামের বেড়িবাঁধ ভেঙে দুটি গ্রামে পানি ঢুকে প্রায় ২০০ পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য হরষিৎ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের হাহাকার কেউ শুনছে না। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে ডুবেছি। এখন জাওয়াদে আবার ডুবলাম।’

বাগেরহাটে তিন দিন ধরে কখনো গুঁড়ি গুঁড়ি আবার কখনো বা টানা বৃষ্টি হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে নদ-নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃষ্টিপাতের কারণে মোংলা বন্দরে জাহাজে মালপত্র ওঠানো-নামানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় দুই থেকে আড়াই ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

ধান ও সবজির ক্ষতি

বরগুনায় বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাসে ক্ষেতে নুয়ে পড়েছে আমন ধান। কৃষকরা আমন ও খেসারির ডালের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করেছেন। তবে কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, ভারি বৃষ্টি না হলে ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নিচু এলাকার বেশ কিছু জমির পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আবার অনেকেই কাটা ধান জমিতে রেখে এসেছে। সেগুলো তলিয়ে গেছে পানিতে। টানা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ঝিনাইদহ জেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বোরো ধানের বীজতলা, সরিষাসহ রবি ফসল ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সাতক্ষীরায় ভারি বর্ষণে ডুবে গেছে জেলার ২০ শতাংশ আমন ধান। বিশেষ করে কেটে রাখা আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরিষা, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির ক্ষেত পানিতে ডুবে যাওয়ায় পচন দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

টানা বৃষ্টিতে যশোরের শার্শায় ডুবে গেছে উঁচু-নিচু সব জমির ধান। বৃষ্টিতে দুশ্চিন্তায় কৃষকরা।

দুই দিনের বৃষ্টিতে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, খিরা, আলু, বাঁধাকপি ও ফুলকপি, টমেটো, লাউসহ প্রায় এক হাজার হেক্টর জমির সবজির ব্যাপক ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

টানা বৃষ্টিতে পটুয়াখালীতে আমন ধানের পাশাপাশি শীতকালিন শাক-সবজি এবং মৌসুমি তরমুজ আবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আরো দু-এক দিন থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে।

রাঙ্গাবালী উপজেলায় নদ-নদীর পানি বেড়েছে দুই থেকে আড়াই ফুট। এতে ফসলের ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। অতিবর্ষণ ও ঝোড়ো বাতাসে হেলে পড়েছে ক্ষেতের পাকা ধান।

পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মহিউদ্দিন বলেন, পরিপক্ব ধানগাছ নুয়ে পড়লেও সমস্যা হবে না। তবে খেসারি, তরমুজ ও শীতকালিন শাক-সবজির ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। জমিতে পানি জমলে দ্রুত অপসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আলু নিয়ে শঙ্কায় কৃষকরা

আলু উত্পাদনের শীর্ষ জেলা মুন্সীগঞ্জে আলু নিয়ে কৃষকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে হওয়া বৃষ্টিতে সদ্য রোপণ করা আলুবীজ নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

একই অবস্থা কুমিল্লায়। বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে সদ্য রোপণ করা আলুক্ষেত। এতে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন জেলার আলু চাষিরা।

তবে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ফসলের উপকার হয়েছে মেহেরপুরে। গত দুই দিনের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে সতেজ হয়ে উঠেছে আলু, বাঁধাকপি, ফুলকপি, শিম, কলা, বরবটি, লাউসহ বিভিন্ন সবজির ক্ষেত। বৃষ্টি কম হওয়ায় বোরো বীজতলারও উপকার হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিএসই) মো. আসাদুল্লাহ আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘সারা দেশে আমন ধানের ৭৫ শতাংশই মাঠ থেকে উঠে গেছে। ফলে বৃষ্টিতে ধানের তেমন ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তা ছাড়া বৃষ্টিও থেমে গেছে। তবে সরিষা, আলুসহ কয়েকটি ফসল যারা নতুন আবাদ করেছে, তাদের সেই উঠতি ফসলের কিছু ক্ষতি হতে পারে। বৃষ্টি যদি আরো হয় এবং সঙ্গে বাতাস থাকে, তাহলে গম, ভুট্টা, সরিষাসহ প্রায় সব ফসলেরই ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।’

ক্ষতির মুখে লবণ চাষিরা

কক্সবাজারের মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, কক্সবাজার সদর, রামু, ঈদগাঁও, টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার উপকূলীয় মাঠে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই লবণের উত্পাদন শুরু হয়। তবে কুতুবদিয়া দ্বীপে মৌসুমের এক মাস আগেই লবণের উত্পাদন শুরু হয়। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কুতুবদিয়ার লবণ চাষিরা। বৃষ্টির কারণে অন্যান্য এলাকার লবণের উত্পাদন কমপক্ষে দুই সপ্তাহ পিছিয়ে গেল।

ট্রলার ডুবে ১৩ জেলে নিখোঁজ

বৈরী আবহাওয়ায় ফিশিং জাহাজের ধাক্কায় ভোলার চরফ্যাশনে একটি মাছ ধরার ট্রলার ডুবে গেছে। এতে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আট জেলে জীবিত উদ্ধার হলেও ১৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সমুদ্র উত্তাল থাকায় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে সারা দেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *