টিআইবির প্রতিবেদন : শিক্ষার ধাপে ধাপে ঘুষ

 টিআইবির প্রতিবেদন : শিক্ষার ধাপে ধাপে ঘুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাধ্যমিক শিক্ষায় নিয়োগ, এমপিওভুক্তি, বদলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কাজে পদে পদে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেন হয়। এর মধ্যে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগে সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়। এ টাকা দিতে হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষা কর্মকর্তা ও পরিচালনা কমিটিকে।

এসব তথ্য উঠে এসেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণা প্রতিবেদনে। ‘মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদন শিক্ষাখাতের নানা অনিয়মের কথা তুলে ধরে এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কয়েকদফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। যদিও শিক্ষা প্রশাসনের কর্তারা এসব অনিয়মের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

বেসরকারি শিক্ষাখাতে ঘুষের নৈরাজ্যে

প্রতিবেদনে বলা হয়, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে এমপি বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির হস্তক্ষেপে সভাপতি মনোনীত করা হয়। এতে অনেকাংশে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সম্পৃক্ত হতে পারে না যা শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কমিটির সভাপতি-সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অশিক্ষিত লোক কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়। এতে করে শিক্ষকদের সাথে কমিটির সদস্যদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিভিন্ন সমস্যা ও দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক সুপারিশকৃত সহকারী শিক্ষকের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়। সহকারী গ্রন্থাগারিক নিয়োগে ২ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এ টাকা দিতে হয় স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা গভর্নিং বডির সঙ্গে জড়িতদের। এসব নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায়েও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে থাকে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি ও কলেজ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা।

শিক্ষক এমপিওভুক্তিতে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ পর্যন্ত টাকা দিতে হয়। আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও নিরীক্ষার কাজে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের এক মাসের এমপিওর টাকা দিতে হয়। এ টাকা দিতে হয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের।

এমপিওভুক্তিতে চার ঘাটে হাদিয়া

প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে টিআইবি বলছে, বর্তমানে চারটি স্থানে ‘হাদিয়া বা সম্মানী’ দিয়ে এমপিওভুক্ত হওয়ার অভিযোগ আছে। বর্তমানে শিক্ষক ও কর্মচারীর এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া অনলাইনে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রধান শিক্ষক উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস বরাবর আবেদন করে থাকেন। পরবর্তীতে আবেদন গ্রহণ ও নথি যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে জেলা শিক্ষা অফিসে এবং জেলা শিক্ষা অফিস থেকে উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। উপ পরিচালকের কার্যালয় থেকে এমপিওর চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ এবং অনলাইন হওয়ার পরও শিক্ষক ও কর্মচারীর ভোগান্তি এবং অনিয়ম ও দুর্নীতি আগের মতোই বিদ্যমান রয়েছে।

টিআইবি বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এমপিও প্রক্রিয়ায় প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষ কর্তৃক আবেদনকারী শিক্ষকের সঙ্গে চুক্তি এবং এমপিও আবেদন অগ্রায়নে ‘শিক্ষা অফিসে এবং কমিটির সুপারিশের জন্য অর্থ লাগবে’ বলে প্রতিষ্ঠান প্রধান কর্তৃক আবেদনকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন। টাকা না দিলে আবেদনে ত্রুটি ধরা, অগ্রায়ন না করা, নথিগত সমস্যার কথা বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়। এছাড়া প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়ম-বহির্ভূত টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্তির অভিযোগ রয়েছে। এমপিও প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণে একটি শিক্ষা অঞ্চলে পাইলটিং প্রকল্প চালু এবং এর ফলাফলের ভিত্তিতে অন্যান্য অঞ্চলে এটি চালু করার পরিকল্পনা থাকলেও তা করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিকেন্দ্রীকরণ পদ্ধতিতে আর্থিক দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হওয়ায় পাইলটিং প্রকল্পের ফলাফলের অপেক্ষা না করে সব শিক্ষা অঞ্চলে এটি চালু করা হয়।

সরকারি শিক্ষক বদলিতে দুর্নীতি

সরকারি চাকরিবিধিমালা অনুযায়ী তিন বছর পর পর বদলির বিধান থাকলেও তা নিয়মিত করা হয় না। তদবির ও নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের মাধ্যমে বদলি বা পছন্দনীয় স্থানে দীর্ঘদিন অবস্থানের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি স্কুলের শিক্ষক বদলিতে এক লাখ থেকে দুই লাখ টাকা দিতে হয়। এ টাকা দিতে হয় মধ্যসত্ত্বভোগী, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।

পাঠদান অনুমোদন ও একাডেমিক স্বীকৃতি পেতেও দিত হয় টাকা

পাঠদান ও একাডেমিক স্বীকৃতির অনুমোদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বোর্ডের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। এতে অনেক ক্ষেত্রে তদবির, নিয়ম বহির্ভূত অর্থ আদায় এবং প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সুপারিশে দূরত্ব সনদ ও জনসংখ্যার সনদ নেয়া এবং ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে তদবিরের মাধ্যমে পাঠদান অনুমোদন নেয়া হয়।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষার অডিটর ম্যানেজ

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় জাল সনদ, নিয়োগে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাতসহ নানান অনিয়ম পাওয়া যায়। জানা যায়, অনিয়ম থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে কখনো কখনো প্রভাব খাটানো হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নথির বিভিন্ন দুর্বলতাকে ব্যবহার করে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায়ে যেমন চাপ প্রয়োগ করা হয়, নথিপত্রের বিভিন্ন দুর্বলতায় পরিদর্শককে ম্যানেজ করতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ দেয়া হয়। নিরীক্ষাকালে প্রতিষ্ঠানের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এক ও দুই মাসের এমপিও’র টাকা দাবি ও আদায় করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রধান শিক্ষক ‘পরিদর্শনে অডিটর আসছে’ বলে শিক্ষকদের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং পরিদর্শককে ম্যানেজ করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষকের কাছ থেকে টাকা আদায় করেন। কখনো কখনো এর একটি অংশ প্রতিষ্ঠান প্রধান আত্মসাৎ করেন। এছাড়া উপ-পরিচালকরা পরিদর্শনে যাওয়ার আগে অনেক ক্ষেত্রে টিমে না পাঠিয়ে একা পাঠানোর জন্য পরিচালক বরাবর তদবির করেন। পরিদর্শনে সংগৃহীত নিয়ম-বহির্ভূত অর্থের বেশিরভাগ অংশ নিজের কাছে রাখার জন্য এই তদবির করা হয়। এক্ষেত্রে পরিচালককে নানা ধরনের উপঢৌকন দিয়ে ম্যানেজ করা হয়ে থাকে।

সরকারিকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি

২০১৭ থেকে ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সরকারিকরণকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের আত্তীকরণে বিলম্ব হচ্ছে, যে কারণে অনেক শিক্ষককে অবসরে যেতে হচ্ছে সরকারি সুবিধা ছাড়াই। আবার শিক্ষার্থীদের পূর্বের মতোই টিউশন ফি দিতে হচ্ছে। সরকারিকরণ প্রক্রিয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়ম-বহির্ভূত অর্থ আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।

দুর্নীতি বন্ধে সরকারিকরণের সুপারিশ

অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। আর তা না হলে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ ও এমপিওর সফটওয়্যার সহজবোধ্য করার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

শিক্ষাখাতে দুর্নীতি বন্ধে আরও কয়েকদফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে সরাসরি রাজস্বখাতের আওতাভুক্ত সমন্বিত জনবল কাঠামো তৈরি করতে হবে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীদের আর্থিক সুবিধা সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে বৃদ্ধি করতে হবে। দ্রুত অবসর ভাতা প্রদানে বাজেটে বরাদ্দ রাখা এবং নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের অধিকতর দক্ষ করে তুলতে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে বৈষম্য দূরীকরণে প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বেসরকারি সব নিয়োগ এনটিআরসিএ বা বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে। শিক্ষকদের পদোন্নতির সুযোগ বৃদ্ধিতে পদক্রম বৃদ্ধি করতে হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বার্ষিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শিক্ষা প্রশাসন যা বলছে

টিআইবির প্রতিবেদন নিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের কর্তারা এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেননি। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়েরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।তবে তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *