দাবি আদায়ে অনড় শিক্ষার্থীরা

 দাবি আদায়ে অনড় শিক্ষার্থীরা

শিক্ষার্থীদের টানা ১৩ দিনের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পরিবহন মালিক সমিতি। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, নিরাপদ সড়কের জন্য তাঁদের ৯ দফার মধ্যে একটি দাবি হচ্ছে অর্ধেক ভাড়া কার্যকর করা। বাকি দাবিগুলো না মানা পর্যন্ত তাঁরা রাজপথ ছাড়বেন না। আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ ছাড়া অর্ধেক ভাড়ার যে ঘোষণা সেটা কেবল রাজধানীর জন্য। সারা দেশে কার্যকর করার দাবিও রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর রামপুরা, ধানমন্ডি, ডেমরা ও যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। আগের দিনগুলোর মতো গতকালও শিক্ষার্থীরা সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের কাগজপত্র ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করে দেখেন।

গত ১৮ নভেম্বর থেকে বাসে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ২৪ নভেম্বর গাড়িচাপায় নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানের মৃত্যুর পর তা রূপ নেয় নিরাপদ সড়কের ৯ দফা দাবির আন্দোলনে। এর মধ্যে গত সোমবার রাতে রামপুরায় বাসের চাপায় মারা যায় এসএসসি পরীক্ষার্থী মাইনুদ্দিন ইসলাম।

মাইনুদ্দিনের বাবা রামপুরায় একটি চায়ের দোকান চালান। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মাইনুদ্দিন সবার ছোট। তাঁদের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সরাইলে। মাইনুদ্দিন নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ওই রাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ১২টি বাসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।

প্রতিবাদ, বিক্ষোভ 

সকাল ১০টার দিকে রামপুরা ব্রিজ অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করে নিহত শিক্ষার্থী মাইনুদ্দিন ইসলামের (দুর্জয়) একরামুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহপাঠীরা। পরে তাদের আন্দোলনে যোগ দেন বিএএফ শাহীন কলেজ, ইম্পেরিয়াল কলেজ, ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজ, আলাতুন্নেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ক্যামব্রিজ কলেজ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক শ শিক্ষার্থী।

বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে মিছিল নিয়ে ধানমন্ডি ২৭-এর উদ্দেশে রওনা হন শতাধিক শিক্ষার্থী। পরে তাঁরা রাপা প্লাজার সামনের সড়ক অবরোধ করেন। সেখানে বিক্ষোভে অংশ নেন ঢাকা কলেজ, নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীরা শুরুতে কোনো গাড়ি চলাচল করতে দিচ্ছিলেন না। এতে তীব্র যানজট দেখা দিলে পুলিশের অনুরোধে শিক্ষার্থীরা অ্যাম্বুলেন্স ও পরীক্ষার্থীদের গাড়ি চলাচলের জন্য আলাদা লেন করে দেন।

কাগজপত্র ঠিক নেই অনেক গাড়ির

আগের দিনের মতো গতকালও শিক্ষার্থীরা সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করে দেখেন। কাগজপত্র ঠিকঠাক না থাকায় শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু যানবাহন আটকে রাখেন। এর মধ্যে চালকের লাইসেন্স না থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি কর্মকর্তা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার গাড়িও ছিল।

শিক্ষার্থীদের আটকে দেওয়া কয়েকটি বাসের বিরুদ্ধে মামলা দেয় পুলিশ। কাগজ না থাকায় বিআরটিসির একটি দোতলা বাস সড়কে রেখে পালিয়ে যান চালক ও তাঁর সহকারী।

দুপুর ১২টার দিকে রাপা প্লাজার সামনে সরকারের একটি বাহিনীর গাড়ি আটকান শিক্ষার্থীরা। দেখা যায়, চালকের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৮ সালে। চালক জানান, তিনি নতুন লাইসেন্স করতে দিয়েছেন। বিআরটিএ থেকে নতুন লাইসেন্স প্রিন্ট করা বন্ধ থাকায় এখনো বুঝে পাননি। শিক্ষার্থীরা উপস্থিত পুলিশ সার্জেন্টকে ডেকে নিয়ে আসেন। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সার্জেন্ট হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে চালকের লাইসেন্সের আবেদনের কপি আনান। সেটা দেখার পর শিক্ষার্থীরা গাড়িটি ছেড়ে দেন।

যানজট, ভোগান্তি

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে কয়েক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে এসব পথে চলাচলকারীরা দুর্ভোগে পড়েন। বড় বোনের অসুস্থতার কথা শুনে মালিবাগ রেলগেটের বাসা থেকে বের হন ৫৭ বছর বয়সী আয়েশা খাতুন। রামপুরা ব্রিজ পর্যন্ত হেঁটে আসেন। তিনি আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘আমার বড় বোন হার্ট অ্যাটাক করেছে। তাঁকে দেখতে যাব বলে বের হয়েছি। কিন্তু মালিবাগ থেকেই সব গাড়ি আটকে আছে। আধা ঘণ্টা ধরে হাঁটছি। এই বয়সে এভাবে হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

শেখ শাহিন ফরিদপুর থেকে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছেন। সঙ্গে মা, বড় বোন ও ভাগনি। শাহিনের দুই হাতে ভারী দুটি ব্যাগ। বোনের কোলে সন্তান। শাহিন বলেন, ‘মালিবাগে বাস থেকে নামিয়ে দিয়েছে। ৪০ মিনিটের বেশি সময় ধরে আমরা হাঁটছি। বোনের বাসায় যেতে আরও আধা ঘণ্টা সময় লাগবে। ঢাকায় এসেই এমন বিপদে পড়েছি আমরা।’

পুলিশের তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার রুবাইয়াত জামান আমাদের বার্তাকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সড়কে অন্তত একটি লেন ছেড়ে দিতে শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো হয়েছে। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা মেনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সহনশীল ও মানবিক আচরণ করা হচ্ছে।

সারা দেশেই অর্ধেক ভাড়ার দাবি

দুপুর পৌনে ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে অর্ধেক ভাড়ার দাবি মানার ঘোষণা দেন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি বলেন, ১ ডিসেম্বর থেকে কেবল রাজধানীতে বেসরকারি বাসে অর্ধেক ভাড়ায় চলতে পারবেন শিক্ষার্থীরা।

এই ঘোষণার বিষয়টি বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের জানায় পুলিশ। জবাবে শিক্ষার্থীরা বলেন, নিরাপদ সড়কের জন্য ৯ দফা দাবির একটি দাবি হচ্ছে অর্ধেক ভাড়া কার্যকর করা। বাকি দাবিগুলোর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বাকি দাবিগুলো মেনে প্রজ্ঞাপন জারি না করা পর্যন্ত তাঁরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। এ সময় ‘আশ্বাস আর না, বাস্তবায়ন কর না’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।

এ সময় রামপুরায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আয়াত উল্লাহ আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘যে ঘোষণা এসেছে, তা দায়সারা গোছের। কেবল ঢাকা নয়, আমরা সারা দেশে হাফ পাস চাই এবং এ নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।’

যাত্রাবাড়ী ও ডেমরায় বিক্ষোভ

দুপুর ১২টার দিকে ডেমরার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা একই দাবিতে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের সামনের সড়কে অবস্থান নেয়। তারা এ সময় বিভিন্ন যানবাহনের চালক ও গাড়ির কাগজপত্র ঠিক আছে কি না যাচাই করে দেখে। পুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার শাহ ইফতেখার আহমেদ আমাদের বার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে পরে সরিয়ে দেওয়া হয়।

যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিক্ষোভ শুরু করেন। যাত্রাবাড়ীর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম আমাদের বার্তাকে বলেন, শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে অবস্থান নিয়েছিল। তারা রাস্তায় নামেনি। পরে তারা ক্যাম্পাসে ফিরে যায়।

বিআরটিএ কার্যালয়ে শিক্ষার্থীরা

গতকাল বেলা দেড়টা থেকে সোয়া চারটা পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ২৫ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থী বনানীতে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। শিক্ষার্থীদের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর আহমেদ মজুমদারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁদের ৯ দফা দাবি তুলে ধরে।

প্রতিনিধিদলের সদস্য ইনজামুল হক বলেন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় দেওয়া ৯ দফা দাবি সরকার এর আগে মৌখিকভাবে মেনে নিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। তাই প্রজ্ঞাপন জারি করে দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিতে হবে। কিন্তু বিআরটিএ নানা অজুহাত দেখাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা জানান, তাঁরা ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নে গত বৃহস্পতিবার পাঁচ দিন সময় বেঁধে দিয়েছিলেন। সেই সময়সীমা পার হয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ কোনো দাবি মেনে নেয়নি। সাংবাদিকেরা এই বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে গেলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহনমালিকদের দাবি মেনে সরকার গত ৭ নভেম্বর বাসভাড়া বাড়ায়। এরপর অর্ধেক ভাড়া দেওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিবহনশ্রমিকদের বাগ্‌বিতণ্ডা ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে থাকে। এরপর ১৮ নভেম্বর থেকে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ নভেম্বর বিআরটিসি বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়ার ঘোষণা দেয় সরকার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন আমাদের বার্তাকে বলেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। দু-একটি দাবি মানলে আন্দোলন ঠান্ডা করা যাবে, সমস্যা থেকেই যাবে। তিনি বলেন, রাজধানীর গণপরিবহনের দায়িত্ব বেসরকারি খাতের বদলে সরকারকেই নিতে হবে। পরিবহন খাতকে শৃঙ্খলায় আনা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *