‘ভাড়া ডাকাতি’ চলছেই

 ‘ভাড়া ডাকাতি’ চলছেই

বর্ধিত ভাড়ার তালিকা উপেক্ষা করে  ওয়েবিলের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া থামছে না। এই নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পদক্ষেপ থাকলেও গা করছে না বাস মালিক-শ্রমিকরা।

এমন পরিস্থিতিতে গণপরিবহনে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়, সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্যসহ সর্বোপরি ‘ভাড়া ডাকাতি’ বন্ধের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করার দাবি’তে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এমন দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটির নেতারা মনে করেন, মালিক-শ্রমিক-সরকার মিলেমিশে একচেটিয়াভাবে গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়েছে। বাসে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন না করে মালিকদের মর্জিমতো ওয়েবিল অনুযায়ী যাত্রীর মাথা গুনে গুনে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ৩ থেকে ৪ গুণ বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। সরকারি তালিকা অনুযায়ী, ভাড়া দিতে চাইলে যাত্রীদের অপমান, অপদস্থ করা, জোর জবরদস্তি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা, প্রতিবাদ করলে কোনো কোনো বাসে যাত্রীদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করে সংগঠনটি।

সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ঢাকার পরিবহন মালিক সমিতির নেতারা বারবার ঘোষণা দিয়ে কথিত সিটিং সার্ভিস বন্ধ-চালুর ইঁদুর-বিড়াল খেলায় মেতে উঠেছেন। এতে বলির পাঁঠায় পিষ্ট হচ্ছেন যাত্রীসাধারণ। নানা অনিয়ম ও অযৌক্তিক, ভুয়া হিসাব দেখিয়ে তেলের দামের চেয়েও কয়েকগুণ বাড়তি ভাড়া বাড়িয়ে নিয়ে এখন রুটে রুটে বাস বন্ধ করে যাত্রীদের জিম্মি করে আরও ৩ থেকে ৪ গুণ বাড়তি ভাড়া আদায়ের পাঁয়তারা করছেন।’ ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানির সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের কাছে সাধারণ যাত্রীদের দীর্ঘ জিম্মিদশার অবসানের জন্য সংবাদ সম্মেলনে ১৩ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো ডিজেলচালিত স্টিকার লাগিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে বিআরটিএ প্রণীত বাস ভাড়ার তালিকা বাসে বাসে স্থায়ীভাবে লাগানোর ব্যবস্থা করা। মালিকদের নির্দেশে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় বন্ধ করে সরকার নির্ধারিত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করা। অন্যায়ভাবে কোনো যাত্রীকে যাতে কোনোভাবে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নৈরাজ্যের মাধ্যমে অপমান-অপদস্থ হতে না হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা। ওয়েবিলে যাত্রী গুনে ভাড়া আদায়ের নামে ‘সিটিং সার্ভিসের’ নামে ভাড়া-ডাকাতি বন্ধে শুধু মৌখিক ঘোষণা নয়, কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সির্টিং সার্ভিসে বাস চালালেও ভাড়া নির্ধারণের শর্তানুযায়ী ৭০ শতাংশ গড়বোঝাই যাত্রী নিয়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় বাস চলাচল নিশ্চিত করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করতে হবে। আর সিটিং সার্ভিসবিহীন বাসে দাঁড়ানো যাত্রীদের হাফ ভাড়া নিতে হবে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ডিজেলচালিত বাস-মিনিবাসের ভাড়া বৃদ্ধির সুযোগে সিএনজিচালিত বাস-মিনিবাসের পাশাপাশি হিউম্যান হলার, লেগুনা, টেম্পো, অটোরিকশায় যে হারে ভাড়া নৈরাজ্য তা বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যাত্রী প্রতিনিধি ছাড়া মালিক-সরকার মিলে একচেটিয়াভাবে বাড়ানো ভাড়া বাতিল করে একটি ন্যায্য ও গ্রহণযোগ্য ভাড়া নির্ধারণ করা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৫৫ শতাংশ যাত্রী ৩ কিলোমিটারের কম দূরত্বে যাতায়াত করে। তাই সিটি সার্ভিসে সর্বনি¤œ বাস ভাড়া ২ কিলোমিটার পর্যন্ত ৫ টাকা নির্ধারণ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর জন্য আলাদা আলাদা ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করতে হবে। ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএর প্রতীকী অভিযান বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা। যেমন রজনীগন্ধ্যা বা মনজিল পরিবহনে কোনো বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকলে বা বেশি ভাড়া নেওয়া হলে ওই কোম্পানির এমডি/ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলে ওই কোম্পানির সব বাস নিয়মনীতির মধ্যে আসতে বাধ্য হবে।

 দূরপাল্লার রুটে ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে কিলোমিটার চুরি ও ভাড়ার তালিকা জালিয়াতি বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া। ভাড়া নির্ধারণের শর্ত লঙ্ঘন করে দৈনিক চুক্তিতে চালক-হেলপারের কাছে বাস ইজারা দেওয়া সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। গণপরিবহনে চাঁদাবাজি, পুলিশের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। কথায় কথায় যেকোনো ঠুনকো অজুহাতে গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়ে যাত্রীদের জিম্মি করার মতো আইনবিরোধী কর্মকান্ড বন্ধ করতে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকার জ¦ালানি তেলে ৭ বছরে মুনাফা করেছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। সেই টাকা দিয়ে ২০ বছর জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দেওয়া যেত। পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি দামে সড়ক, সেতু নির্মাণ ও বেশি দামে কেনাকাটার অর্থ জোগান দিতে তেলের দাম বাড়িয়ে গণপরিবহনে নৈরাজ্যের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। তেলের দামের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে গিয়ে যাত্রীদের নাভিশ্বাস উঠছে।’

হাফ ভাড়া কার্যকরের দাবিতে রাস্তায় শিক্ষার্থীরা: হাফ ভাড়া কার্যকরের দাবিতে ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সকাল ১০টায় প্রথমে কলেজের মূল ফটকে অবস্থান করলেও, পরে রাস্তায় বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এক ঘণ্টা পর কলেজ প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি আদায়ের নিশ্চয়তা দিলে রাস্তা থেকে ফিরে যান আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারী একাধিক শিক্ষার্থী জানান, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর থেকে বাস মালিক সমিতি এবং বাস শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। হাফ ভাড়া নেওয়ার পরিবর্তে তাদের সঙ্গে অশোভন আচরণে অতিষ্ঠ সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া গাড়ি থেকে লাঞ্ছিত করে নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও পরিলক্ষিত হচ্ছে।

ঢাকা কলেজশিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ জানান, বৃহস্পতিবার সকালে ‘মিরপুর মেট্রো’ বাসে করে ক্যাম্পাসে যাওয়ার সময় হাফ ভাড়া দিতে চাইলে, তা নেওয়ার পরিবর্তে তার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে বাসের হেলপার।

ঢাকা কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইদুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষকরা আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, তারা মালিক সমিতির সঙ্গে বসে দ্রুত আমাদের হাফ ভাড়া নিশ্চিত করবেন।’ এ সময় শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে বলা হয়, ‘আগামীকালের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আমরা শনিবার থেকে রাস্তায় অবস্থান করব এবং প্রয়োজনে কঠোর আন্দোলনে যাব। আমরা আমাদের দাবি আদায় করেই নেব।’

তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যে বাস-মালিক সমিতির সঙ্গে মিটিংয়ে বসে শিক্ষার্থীদের দাবি পুলিশ প্রশাসন ও মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে বাস্তবায়নের আশ্বস্ত করেছে, ঢাকা কলেজ শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. আবদুল কুদ্দুস শিকদার।

পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ঢাকা কলেজের মূল ফটকে অবস্থান করে এবং পরে মিরপুর-নিউমার্কেট রোডে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় কয়েকটি বাস আটকে রাখা হয়। পরে কলেজ প্রশাসন ও নিউমার্কেট থানার ওসি স ম কাইয়ুমের আশ্বাসে শনিবার সকাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে বাসের চাবি ফিরিয়ে দিয়ে রাস্তা থেকে সরে যান শিক্ষার্থীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *