শেখ হাসিনা: দ্য লেডি অব ঢাকা

 শেখ হাসিনা: দ্য লেডি অব ঢাকা

মুহম্মদ শফিকুর রহমান, এমপি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর একটি ইংরেজি প্রবন্ধ লেখার জন্য এই শিরোনামটি সিলেক্ট করেছিলাম। তাঁর ৭৫তম জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বরে যে কলামটি লিখতে যাচ্ছি তাতেও ওই শিরোনামটি রেখে দিলাম এজন্য যে, একজন বিদেশি সাংবাদিক যখন তাকে পরিচয় করিয়ে দেন তখন দ্য লেডি অব ঢাকা (The lady of Dhaka) বলেই পরিচয় করান। অবশ্য নিউইয়র্কে পালিয়ে থাকা কতিপয় ব্যক্তির ভাষা ভিন্ন। তারা নানাভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সামাজিক যোগাযোগসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে কুৎসা ছড়াচ্ছে। তাই তাদের গুরুত্ব না দিয়ে মূল কথায় আসি।

শেখ হাসিনার জন্ম দেশভাগের অল্প কদিন পর, ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তাঁর পৈতৃক বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে শেখ পরিবারে। ওই বছরই বঙ্গবন্ধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইসলামিয়া কলেজে) গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকায় ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে (এলএলবি) ভর্তি হন। তখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং অল্পদিনেই নেতৃত্বে চলে আসেন। এর পরেই শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আন্দোলন। বঙ্গবন্ধু এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। শুরু হয় তার কারাজীবন- ৫ দিন বাসায় তো পঞ্চাশ দিন কারাগারে। শুনেছি বঙ্গবন্ধু এক মামলা থেকে জামিন নিয়ে বাসায় গেলে পরে দুই-একদিনের মধ্যে আবার গ্রেপ্তার হন কারাগারে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে এবং জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা তার দৈনন্দিন ব্যবহার্য কাপড়-চোপড়, সাবান-ব্রাশ-পেস্ট ইত্যাদি দিয়ে স্যুটকেস সাজিয়ে রাখতেন। এইভাবে শেখ হাসিনা বড় হয়েছেন। তাঁর রাজনীতির পাঠ শুরু ঘর থেকেই।

সাধারণের মাঝে অসাধারণ

টুঙ্গিপাড়া গ্রামটিও ছিল অসাধারণ। নানান গাছগাছালি। একদিকে মধুমতি, আরেকদিকে বাইগার বাঘিয়া এই দুই নদীর সংযোগ খালপাড়ে শেখ বাড়ি। আড়াইশ বছর আগে ইরাক থেকে প্রথমে দিল্লি এবং পরে খুলনা হয়ে এই গ্রামে এসে বসবাস করতে শুরু করেন। পরিবারে লেখাপড়া ছিল প্রধান, তারপর খেলাধুলা সঙ্গীতচর্চা, এভাবে উন্নত সংস্কৃতির বাঙালি মুসলিম পরিবার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কোনো তুলনাই হয় না কারো সঙ্গে। একটি উদাহরণ হলো, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তৎকালীন ইপিআর’র ওয়ারলেসের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। এরপরই পাকি আর্মি জান্তা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগারে নিয়ে বন্দী করে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তারের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব সন্তানদের নিয়ে পাশের বাড়িতে চলে যান, কিন্তু পাকি আর্মি তাদেরও সেখান থেকে গ্রেপ্তার করে, ধানমণ্ডির ১৮নং সড়কের একটি বাড়িকে সাবজেল বানিয়ে বন্দি করে রাখা হয়। এ অবস্থায়ও বঙ্গমাতা বেগম মুজিব তার সন্তান শেখ হাসিনা, শেখ কামাল ও শেখ জামালকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য রাতের অন্ধকারে ঘর থেকে বের করে দেন। কামাল ও জামাল সোজা ভারতে চলে যান এবং সেখানে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দুজনই রেগুলার আর্মি হিসেবে ট্রেনিং নেন। বিজয়ের আগেই ক্যাপ্টেন এবং লেফটেন্যান্ট হিসেবে উন্নীত হন। দেশপ্রেমের এমন উদাহরণ কয়টাইবা আছে। অথচ মেজর জিয়া যখন চট্টগ্রাম থেকে ভারতে গিয়ে বেগম জিয়াকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ২টি গ্রুপকে পাঠান তখন বেগম জিয়া যেতে অস্বীকার করেন, বরং এমনও নাকি মন্তব্য করেন মুক্তিযুদ্ধ-ফুদ্ধ কিছু না, অচিরেই পাকিস্তান আর্মি সব ঠিক করে দেবে, বরং জিয়াকেই বল ফেরত আসতে। এই বলে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং ক্যান্টনমেন্টে আশ্রয় নেন। শুনেছি যে দুটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ বেগম জিয়াকে ভারতে নিয়ে গিয়েছিল সেই দুই গ্রুপে নেতৃত্ব দেন সাপ্তাহিক বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরী ও কুমিল্লার মুক্তিযোদ্ধা খায়রুল আলম বাদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী এবং শেখ হাসিনারও। বছর দুই-এক আগে আমার বনানীর বাড়িতে ক্লাসমেটদের এক গেট-টুগেদারের কাহিনী বর্ণনা করেন। তার কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।
আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শেখ হাসিনাকে কাছ থেকে দেখার। তার শৈশব কেটেছে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে পঞ্চাশের দশকে বাবা-মার সঙ্গে ঢাকায় চলে এসে প্রথমে গোপীবাগের নারীশিক্ষা মন্দিরে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হন। এর কিছুদিন পর আজিমপুর গার্লস হাই স্কুল এবং এখান থেকেই এসএসসি পাস করেন (১৯৬৫) এবং এরপর ইডেন গার্লস কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি এবং এখান থেকে এইচএসসি পাস করে (১৯৬৭) ওই বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম বর্ষ অনার্সে ভর্তি হন। ওই বছর আমিও একই বিভাগে ফার্স্ট ইয়ার অনার্সে ভর্তি হই এবং এভাবেই আমার সুযোগ হয় তাকে খুব কাছ থেকে দেখার। এ সঙ্গে একটা কথা বলা দরকার, ইডেনে অধ্যয়নকালে (যা বর্তমানে বদরুন্নেসা কলেজ) শেখ হাসিনা ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন।

শেখ হাসিনা দাদা শেখ লুৎফর রহমান ও দাদি শেখ সাহেরা খাতুনের আদর-যত্নে ছিলেন এবং ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করেন। যেদিন গ্রাম ছেড়ে চলে আসছিলেন সেদিন তার খেলার সাথীরা যাদের সাথে একসঙ্গে ধানক্ষেতের আল দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করতেন, দুই বেনী উড়িয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরতেন, সেই সাথীরা খালপাড় দিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে বন্ধুকে বিদায় জানালেন চোখের জলে। অজান্তে শেখ হাসিনার চোখ থেকেও দুই ফোটা অশ্রু ঝরে পড়েছিল। আর তাইতো পরবর্তীকালে দেখেছি তিনি একদিনের জন্যও গ্রামকে ভোলেননি। বরং দাদা-দাদি ও বঙ্গবন্ধুর কবর সেখানে থাকায় আরো টান অনুভব করতে থাকেন এবং বারবার টুঙ্গিপাড়ায় ছুটে যান।
১৯৬১ সালে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ওঠেন। তৎকালীন ডিআইটি (বর্তমানে রাজউক) একটি প্লট বরাদ্দ দেয়। ওই প্লটের ওপর দেড়তলা বাড়ি নির্মাণ করা হয়। বাড়ি বানানোর জন্য হাউজ বিল্ডিং কর্পোরেশন থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন তারা। ঋণের সব টাকা পরিশোধের আগেই ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি ঘটে যায়। যে কারণে ঋণের কয়েকটি কিস্তি না দেয়ায় বাড়ি নিলামে তোলা হয়। অবশ্য পরে মাফ চেয়ে সমাধান হয়। সেই রাতে বিদেশে থাকায় বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা রক্ষা পান। পরে তারা ভারতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আশ্রয়ে থাকেন। ইন্দিরা গান্ধী শেখ হাসিনার স্বামী প্রখ্যাত অনুবিজ্ঞানী ড. এম ওয়াজেদ আলী মিয়াকে একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এরই মধ্যে ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, ছোট বোন শেখ রেহানার বিয়ে এবং সেইসঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্তে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের কয়েকজন এমপির সঙ্গে আলোচনা করেন তারা। বাংলাদেশে আসতে চাইলে জিয়া তাতে বাধা দেন, কারণ জিয়া ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। এরপর ১৯৮১ সালে ঢাকার হোটেল ইডেনে, দলের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতভাবে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তারপর শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে চাইলে জিয়া এই ক্ষেত্রেও বাধার সৃষ্টি করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকন্যাকে বাধা দিয়ে রাখে জিয়া কেন, অন্য কোনো মিয়ারও সাধ্য নেই। তিনি সব বাধা অতিক্রম করে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দেশে ফেরেন। তখন তেজগাঁও এয়ারপোর্টে ইন্টারন্যাশনাল প্লেন নামতো। সেদিন দিনভর ঝড় ছিল এবং এই ঝড়ের মধ্যেই বিমানবন্দর থেকে শুরু করে প্রথমে মানিক মিয়া এভিনিউতে সংক্ষিপ্ত ভাষণ শেষে ধানমণ্ডি ৫নম্বর বাসভবনে চলে যান। সেদিন ঝড়ের মধ্যেও বিমানবন্দর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে ধানমণ্ডি ৫ নম্বর পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে গাছের ডালে বাড়ির ছাদের রেলিংয়ে কত লোক হয়েছিল অনুমান করা সম্ভব নয়। প্রায় ১০ লাখ বা তার বেশিও হতে পারে। সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী, সাধারণ মানুষ নেত্রীকে একনজর দেখার জন্য রাজপথে জড়ো হয়েছিল। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যেদিন পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন, কেবল সেদিনের সঙ্গে তুলনা হতে পারে। অন্য কোনো জনসমাগমের সঙ্গে হতে পারে না।
বলেছিলাম আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শেখ হাসিনাকে কাছে থেকে দেখার। বলেছিলাম এজন্য যে আমরা ক্লাসমেট ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আন্দোলন ও আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে ৬+১১ দফা ভিত্তিক ছাত্র গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়ে গেছে। ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক আন্দোলনের নেতা ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, আসম আব্দুর রব, আব্দুল কুদ্দুস মাখন, তাদের পেছনে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, সাইফুদ্দিন আহমেদ মানিক, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, হায়দার আকবর খান প্রমুখ। নারী নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন মমতাজ বেগম, রাফিয়া আক্তার ডলি, দীপা দত্ত, শেখ হাসিনা, নাসিমুন আরা হক মিনু, আয়েশা খানম প্রমুখ। প্রতিদিন সকালে ক্লাসে গিয়েই ইয়েস স্যার বা ইয়েস ম্যাম বলে আমরা বেরিয়ে পড়তাম। সকাল থেকে রাত অবধি মিছিল-মিটিং হতো। শেখ হাসিনা এইসব মিছিলে অংশগ্রহণ করতেন, এমনকি পুলিশের সাথে সংঘর্ষে পেছনে দৌড়াতেন না। শেখ হাসিনাকে তখন সবাই হাসিনা শেখ বলে ডাকতেন। এর মধ্যেও তিনি যথারীতি লেখাপড়া চালিয়ে যান।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের এক নম্বর পরিবারের সন্তান হয়েও অত্যন্ত সাধারণ তাঁতের শাড়ি পড়ে ক্লাসে আসতেন। কখনো শেলোয়ার-কামিজ পরতে দেখিনি। আর দশজন নারীর মতো সাদামাটা জীবন। ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ির পরিবেশ ছিল তেমনি সাদামাটা। জিয়া সরকার যেদিন বাড়িটি শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন সেদিন ইত্তেফাকের রিপোর্টার হিসেবে বাড়ির অভ্যন্তর দেখেছি, দেখে অবাক হয়েছি ওই বাড়িতে একটা দামি সোফা বা ক্লজিট ছিল না। দামি জিনিস বলতে বঙ্গবন্ধুর পড়ার ঘরে বই আর শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, জামাল, রাসেল, রেহেনার ঘরেও একই চিত্র। কেবল কামাল-জামাল-রাসেলের ঘরে অতিরিক্ত সংগীত ও খেলার সরঞ্জাম ছিল। সর্বশেষ যে কথাটি আমি বলব, বাড়ির পরিবেশ একেবারেই শিক্ষিত রুচিবান মধ্যবিত্ত পরিবার। এই ভাবেই তাদের সবাইকে সাধারণের মাঝে অসাধারণ করে তুলেছে। আর শেখ হাসিনা চতুর্থ মেয়াদে সরকার পরিচালনা করে বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হয়ে উঠেছেন দ্য লেডি অব ঢাকা।

লেখক : সদস্য, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি, সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেস ক্লাব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *