হুমকি–ধমকি চলছে, কোনো ব্যবস্থা নেই

 হুমকি–ধমকি চলছে, কোনো ব্যবস্থা নেই

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের কেউ ক্রসফায়ারে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন, কেউবা একে–৪৭ রাইফেলের ভয় দেখিয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিলেও কারও বিরুদ্ধে সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এসব বক্তব্য দিলেও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নীরব রয়েছে। কোথাও কোথাও শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েই দায়িত্ব সেরেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

ইউপি নির্বাচনের তিনটি ধাপ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সামনে চতুর্থ ও পঞ্চম ধাপের নির্বাচন হবে। প্রকাশ্য সভায় প্রতিপক্ষকে কেউ হুমকি দিয়েছেন, আবার কোথাও উসকানিমূলক বক্তব্যের ফোন রেকর্ড বা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল (ছড়িয়ে পড়া) হয়েছে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন আমাদের বার্তাকে বলেন, নির্বাচনে বাগ্‌যুদ্ধ হয়েই থাকে। তবে কোনো সংঘাত-সহিংসতা যাতে না হয়, সে জন্য তৃণমূল নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।

অস্ত্রের ভয় দেখান তাঁরা

কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হুমাইপুর ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মামুন প্রতিপক্ষের প্রার্থী ও সমর্থকদের একে-৪৭-এর ভয় দেখিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে প্রয়োজনে একে-৪৭ ব্যবহার করা হবে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেননি।

বাজিতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম বলছেন, ‘একে-৪৭-এর ভয় দেখানোর খবর আমাদের কাছে আসার পর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়ে রেখেছিলাম।’

গত ১১ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হুমাইপুর ইউপির নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী জয়লাভ করেন।

দ্বিতীয় ধাপে মাদারীপুরের কালকিনির লক্ষ্মীপুর ইউপি নির্বাচনে এক পথসভায় উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আফজাল হোসেন মোল্লা হুঁশিয়ারি বলেছিলেন, ‘…দুইডা অস্ত্র লইয়া আমি থাকমু, কারও বাপ-পুত থাকলে আমার সামনে জানি আসে। দয়া কইরা নৌকার বিরুদ্ধে কেউ যাইয়েন না। নৌকার বিরুদ্ধে গেলে কারও বাঁচন নাই।’

এই বক্তব্য প্রচার হওয়ার পর গত ৮ নভেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তা মিল্টন বিশ্বাস আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী মজিবর রহমান মোল্লাকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠান এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলেন। কিন্তু প্রার্থী কোনো জবাব দেননি। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী জামানত হারিয়েছিলেন।

অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেওয়ার পরও পুলিশ নীরব ছিল। কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইশতিয়াক আশফাক বলেন, আফজালের অস্ত্রটি লাইসেন্স করা। যদি তাঁর লাইসেন্স জেলা প্রশাসন থেকে বাতিল করে, তাহলে অভিযান চালিয়ে সেটি জব্দ করা হবে।

নৌকায় প্রকাশ্যে ভোটের আহ্বান

‘টেবিলের ওপর হবে নৌকার ভোট’, ‘নৌকার ভোট হবে ওপেন’, ‘প্রকাশ্যে নৌকায় সিল মারতে হবে’। ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে বিভিন্ন জনসভা ও পথসভায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্যও দিয়েছেন।

গত ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সাবেক সাংসদ ও দৌলতপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী বলেছিলেন, ‘২৮ তারিখে ভোট হবে। সেই ভোটের দিনে মেম্বার ভাইয়েরা আছেন, তাঁদের আমি অনুরোধ করব, আপনারা প্রকাশ্যে নৌকায় ভোট মারবেন। তারপর আপনারা আপনার মেম্বারের ভোট গোপনে ব্যালট পেপারে মারবেন। যাঁরা মারবেন না, তাঁরা কেন্দ্রে যাবেন না।’

এমন বক্তব্যের পর তাঁর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা, দল, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

নৌকায় প্রকাশ্যে সিল মারার ঘোষণা দিয়ে আলোচনায় আসা টাঙ্গাইলের কালিহাতীর গোহালিয়াবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল হাই আকন্দের বিরুদ্ধে পুলিশ বা নির্বাচন কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেননি। পুলিশ ও নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, এ ব্যাপারে তাঁদের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভাদুর ইউপি নির্বাচন উপলক্ষে কর্মিসভায় কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য হাবিবুর রহমান ওরফে পবন বলেছিলেন, ‘মাইন্ড ইট (মনে রাখবেন), নৌকার ভোট ওপেন (উন্মুক্ত) হইতে হবে। মেম্বারি (ইউপি সদস্য) যেই করেন, গোপনে আপনাদের কেউ ভোট দিক, এটাতে আমাদের কোনো অসুবিধা নাই। কেউ কাউকে ডিস্টার্ব করবেন না। কিন্তু নৌকাকে ওপেন রাইখা করতে হবে। এর বাহিরে কোনো কথা নাই।’ এরপর সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তা নৌকার প্রার্থীকে কেবল কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিলেন। আর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।

মেহেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এম খালেক বলেছিলেন, ‘নৌকার সিল হবে ওপেন এবং টেবিলে। একের অধিক সিল মারতে হবে। পুলিশ, প্রিসাইডিং কর্মকর্তারা কিছু করতে পারবেন না।’

এই বক্তব্য প্রচারের পর খালেককে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছিলেন উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কবির উদ্দিন। জবাবে খালেক বলেছিলেন, ভবিষ্যতে এমন বক্তব্য আর দেবেন না।

একের পর এক হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না, এমন অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম আমাদের বার্তাকে বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া আছে, অভিযোগ পেলেই যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেন। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া তো ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। এসব বিষয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর সাধারণত কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সরাসরি অস্বীকার করে বসেন।

একজনের জয়, আরেকজনের পরাজয়

আগেরবার ‘আধা ঘণ্টায় ভোট’ করেছিলেন। এবার ৫ মিনিটেই ভোট শেষ করতে চেয়েছিলেন শেরপুরের নকলার উরফা ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. রেজাউল হক। অবশ্য তৃতীয় দফায় উরফা ইউপির ভোট সুষ্ঠুভাবেই হয়েছে। আর রেজাউল হক হেরে গেছেন।

নকলা উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা তারেক আজিজ বলেন, রেজাউল হকের বিতর্কিত বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তাঁকে কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানো হয়। সেই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় উরফা ইউপির নয়টি কেন্দ্রে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

৫ মিনিটে ভোট শেষ করতে চাওয়া রেজাউলের বিরুদ্ধে দলীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার মানিকাচর ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মো. জাকির হোসেন গত ২৯ অক্টোবর রাতে মাধবপুর গ্রামে উঠান বৈঠক করেন। তিনি তাঁর মনোনয়নের জন্য পুলিশের মহাপরিদর্শক মনোনয়ন বোর্ডে গেছেন বলেও বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ডিআইজি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে পাঁচ মিনিট বসে থাকতে হয় বলে উল্লেখ করেন। এমন বক্তব্যের পর দল থেকে তাঁর কাছে শুধু বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়েছে। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মেঘনা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল্লাহ মিয়া বলেন, ‘দল থেকে আমরা জাকিরকে মৌখিকভাবে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি এই বক্তব্য দিয়েছেন কি না। তখন তিনি বলেছিলেন, ওইভাবে বলেননি।’

ওই ইউপিতে দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে জাকির হোসেন জয়ী হন।

‘যাঁরা অন্য মার্কায় ভোট দিবেন, তাঁরা দয়া করে বাড়িতে থাকিয়েন’

‘যাঁরা অন্য মার্কায় ভোট দিবেন, তাঁরা দয়া করে বাড়িতে থাকিয়েন। নৌকা মার্কায় যাঁরা ভোট দিতে চান, তাঁরা দয়া করে এসে ভোট দিবেন।’ গত বুধবার রাতে ঠাকুরগাঁও জেলার রুহিয়া পশ্চিম ইউনিয়নের ধনতলাডাঙ্গায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী পথসভায় এই হুমকি দেন সদর উপজেলার রুহিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ। তিনি বলেন, ‘একটা ভোট পাইলেও ২০ নম্বর ইউনিয়নে নৌকা মার্কার চেয়ারম্যান প্রার্থীকে বিজয়ী করব…বিএনপি যাঁরা করেন,…ইজ্জত বাঁচানোর স্বার্থে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে নিজেকে যেন মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন।’

এমন বক্তব্যের বিষয়ে আবু সাঈদ আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘রুহিয়া উপজেলার দাবির পক্ষে এসব বলে ফেলেছি।’

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী সাইফুল হাসানের কর্মী রিয়াজ উদ্দিনকে ক্রসফায়ারে হত্যার হুমকি দেওয়ার একটি অডিও ৩ ডিসেম্বর ফাঁস হয়। ভবানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল খালেকের ভাতিজা আবদুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে এ হুমকি দেন বলে অভিযোগ ওঠে।

অডিও রেকর্ডিংয়ে আবদুল্লাহকে বলতে শোনা যায়, ‘এই মিজি (রিয়াজ উদ্দিন) নিরে। মিজি, যদি আর একটা স্ট্যাটাস দেস নৌকার বিরুদ্ধে, তাহলে তোরে বাড়িত তন (বাড়ি থেকে) ধরি আনি (এনে) ক্রসফায়ার করিয়াম। নৌকার বিরুদ্ধে কোনো স্ট্যাটাস দিলে ডাইরেক্ট আঁকি হালাইয়াম তুই যিয়ানেই থাস (থাকিস)।’

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ঘটনাটি শুনেছি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

চতুর্থ ধাপে ২৬ ডিসেম্বর ভবানীগঞ্জসহ লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ভোটের মাঠে পেশিশক্তির দাপট, প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতে না দেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে হুমকির বিষয়সহ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, হুমকি–ধমকিসহ অন্যায় করেও যদি কেউ পার পেয়ে যায়, তাহলে এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। এসব বন্ধে নির্বাচন কমিশনকে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনীতি এখন জনকল্যাণ নয়, লাভের বিষয় হয়ে গেছে। এটাই হলো মূল রোগ। এ জন্য রাজনীতিকে আগে জনকল্যাণমুখী করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *