৬ টাকা কেজিতেও আলু বিক্রি করতে পারছেন না চাষীরা

 ৬ টাকা কেজিতেও আলু বিক্রি করতে পারছেন না চাষীরা

প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ৬ টাকা দরে। তবুও মাঠে ক্রেতা নেই। উৎপাদিত আলু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের চাষীরা। গত বছর অধিক দামে আগাম আলু বিক্রি করে লাভবান হওয়ায় এবারও লাভের আশায় আগাম আলু চাষে ঝুঁকেছিলেন তারা। কিন্তু আগাম আলুর বাজারে ধস নামায় লোকশান হচ্ছে তাদের। গত বছর চাষীরা এই সময় প্রতি কেজি আলু মাঠেই বিক্রি করেছিলেন ২৫-৩০ টাকা দরে আর এবার সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬ টাকা দরে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলার পাঁচ উপজেলায় এবার ২৭ হাজার ৬৪৭ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। ইতোমধ্যে ২ হাজার ৭৭০ হেক্টর জমির আলু তোলা হয়েছে। আলু উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে ২৪ মেট্রিক টন। বর্তমান বাজার দরে আলু বিক্রি করে প্রতি হেক্টরে (২৪৭ শতক) চাষীরা দাম পাচ্ছেন ৯০-১০০ হাজার টাকা। আর প্রতি হেক্টর আলুর উৎপাদন খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। গত বছর জেলায় ২৮ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। আর উৎপাদন হয়েছিল ৭ লাখ ৪১ হাজার ২৯৭ মেট্রিক টন। কৃষি বিভাগ বলছে- গত বছরের কিছু আলু মজুদ থাকায় বাজার দর কম। পুরাতন আলু শেষে হলে দাম কিছুটা বাড়তে পারে।

আলুর মাঠে বর্তমান সময়ে গ্র্যানোলা জাতের সাদা ও এস্টারিক্স জাতের লাল আলু পাওয়া যায়। স্থানীয় বাজারে লাল আলুর চাহিদা বেশি থাকায় লাল আলুর দাম কিছুটা বেশি। আর সাদা আলুর বাজার রাজধানীসহ অন্য জেলায় হওয়া কারণে অন্য জেলার চাহিদার উপর নির্ভর করে দাম পায় চাষীরা। বর্তমানে সাদা আলু ৬ টাকা ও লাল আলু ১০-১১ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী। মুন্সিগঞ্জের পরেই আলু চাষে ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থান। সে হিসেবে দেশে আলু উৎপাদনে ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রতি বছরই এ জেলায় আলু চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে অন্য জেলাতে সরবরাহ করা হয় এখানকার আলু। সাধারণত মাটিতে এক বার আলু রোপণ করলে এক বার ফলন পাওয়া পাওয়া গেলেও এবারের চিত্র ছিল ভিন্ন। চাষীরা এবার দুই বার আলু রোপণ করে ফলন পাচ্ছেন মাত্র এক বার। সে কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে চাষীদের। তাছাড়া বাজার অবস্থা ভালো না থাকায় লোকশানে পড়েছেন চাষীরা। আগাম আলু রোপণের কয়েকদিন পরেই বৃষ্টি হয়, তাই রোপণকৃত আলু মাঠেই পঁচে যায়। আবারও লাভের আশায় সেই জমিতে আলু রোপণ করেন চাষীরা।

সদর উপজেলার ফকদনপুর এলাকার আলু চাষী সোহাগ আলী বলেন, ‘গত বছর আলুর দাম বেশি ছিল, ফলে কম ফলনেও ভালো লাভ হয়েছিলো। এবার বেশি ফলনেও লোকশান হচ্ছে। লাভ তো দূরের কথা, আসলও তুলতে পারছি না। কম দামে আলু বিক্রি করে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। তার পরেও নগদ টাকার ক্রেতা নেই।’

সদর উপজেলার পটুয়া এলাকার আরেক আলু চাষী মোঝারুল ইসলাম বলেন, ‘সাড়ে ৪ একর জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা। ৬ টাকা দরে আলু বিক্রি করে দাম পাচ্ছি ২ লাখ টাকা। এই টাকায় লাভ তো নয়, আসল টাকাও আসে না। আলু চাষ করে আরও ধার-দেনায় পড়ে গেলাম।’

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ভানোর এলাকার আলু চাষী আলাউদ্দীন বলেন, ‘প্রথমবার ২ একর জমিতে আলু লাগানোর কয়েকদিন পরে বৃষ্টির কারণে বীজ আলু মাটিতেই পঁচে যায়। আবারও সেই জমিতে আলু লাগায়। আলুর ফলন ভালো হয়েছে। ব্যবসায়ীরা ৬ টাকা কেজি বলছে, বিক্রি করিনি। কারণ এই দামে বিক্রি করলে অনেক টাকা লোকশান হবে।’

ঠাকুরগাঁও রোড এলাকার আলু ব্যবসায়ী আলম বলেন, ‘বর্তমান সময়ে বিভিন্ন জেলার আলু এক সঙ্গে বাজারে আসায় চাহিদা কিছুটা কম। রাজধানীর আড়ৎ থেকে কোনো অর্ডার পাচ্ছি না। সে কারণে বাজারে দাম নেই। অনেক আলু বেশি দামে কেনা আছে, কিন্তু দাম কমে যাওয়ার কারণে বিক্রি করতে পারছি না।’

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর উপ-পরিচালক আবু হোসেন, ‘গত বছরের বাড়তি আলুর মজুদ শেষে হলে বাজার অবস্থা ঠিক হবে। সেই সঙ্গে আলুর ফলন ভালো হলে চাষীদের লোকশান পুষিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন, ১দেশের উৎপাদিত আলু অন্য দেশে রপ্তানি করতে পারলে দেশের অর্থনীতি পরিবর্তনের পাশাপাশি চাষীদের ভাগ্য পরিবর্তন হবে। বেকারদের কর্মের ব্যবস্থাও হবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *