১২০০ কোটি টাকার বেশি কর হারাচ্ছে বাংলাদেশ

 ১২০০ কোটি টাকার বেশি কর হারাচ্ছে বাংলাদেশ

বহুজাতিক কম্পানি ও অতি সম্পদশালী ব্যক্তিদের কর ফাঁকির কারণে বাংলাদেশ বছরে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় এক হাজার ২৩৭ কোটি টাকা এবং দেশের বার্ষিক কর রাজস্বের প্রায় ১ শতাংশের সমান।

কর ন্যায্যতার বৈশ্বিক জোট ‘ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক’ ও গ্লোবাল ইউনিয়ন ফেডারেশন পাবলিক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

‘দ্য স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস ২০২১’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে তারা বলছে, কর রাজস্ব হারানোয় দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। ভারত (এক হাজার ৬৮৩ কোটি ডলার) ও পাকিস্তান (৭৫ কোটি ৯০ লাখ ডলার) প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।

তবে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলছেন, প্রতিবেদনে প্রকাশিত কর ফাঁকির পরিমাণ অনেক কম। তিনি গতকাল আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘প্রতিবেদনে বাংলাদেশের যে কর ফাঁকির পরিমাণ প্রকাশ করা হয়েছে তা দেখে আমি বেশ বিস্মিত। এই সংখ্যা তারা কীভাবে পেল তা জানা দরকার। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সংখ্যা অনেক দেশের জিডিপির মাত্র ০.০৪ শতাংশ। যদি এটি সঠিক সংখ্যা হয় তাহলে আমি মনে করি আমাদের জন্য তা সুখবর।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের কর দেওয়ার প্রবণতা অনেক কম। সে অনুপাতে কর ফাঁকির পরিমাণ অনেক কম, আমার কাছে এই সংখ্যা সন্দেহজনক।’

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ আমাদের বার্তাকে বলেন, ‘এটা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। বহুজাতিক কম্পানি যদি বাংলাদেশে এসে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে চলে যায়, সেটি কাদের গাফিলতির জন্য হচ্ছে। সে কি ইচ্ছা করে ফাঁকি দিয়ে চলে যাচ্ছে। না দেশের পরিবেশই এ রকম।’

তিনি বলেন, এ ব্যাপারে রাষ্ট্র, সরকার ও অর্থনীতিকে উদ্বিগ্ন হতে হবে। উদ্বিগ্ন হতে হবে এ জন্যই এখানে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্ন জড়িত। রাজস্বের স্বার্থ জড়িত। রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে এ তথ্যটি সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। তারা যে হিসাবটি দিয়েছে, কিসের ভিত্তিতে দিয়েছে। তাদের তথ্য ঠিক থাকলে সরকারকে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে যাচাই-বাছাই করা দরকার।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, হারানো এই কর রাজস্ব ৮৩ লাখ ৬৯ হাজার ৯৯১ জনকে বা মোট জনসংখ্যার ৫.৩ শতাংশকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অর্থ স্বাস্থ্য খাতের মোট বরাদ্দের ১৪.৫২ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের সমপরিমাণ কর রাজস্ব হারাচ্ছে, তার মধ্যে ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের জন্য দায়ী বহুজাতিক করপোরেশন এবং দুই কোটি ৬০ লাখ ডলারের জন্য ধনী ব্যক্তিরা। বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭০ কোটি ডলার, যা বিদেশে থাকা মোট বৈশ্বিক সম্পদের ০.০২ শতাংশ। এই অর্থ মোট জিডিপির ০.৬ শতাংশ। নাগরিকদের বিদেশে রাখা এই সম্পদ থেকে বাংলাদেশ বছরে দুই কোটি ৫৭ লাখ ডলারের কর রাজস্ব হারাচ্ছে বলে স্টেট অব ট্যাক্স জাস্টিস প্রতিবেদনে বলা হয়।

এ বছর নেটওয়ার্ক দি ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে) ফাঁস করা প্যান্ডোরা পেপারস নথিতে দেখা যায়, কিভাবে অফশোর কম্পানি ব্যবহার করে ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের (বিভিআই) মতো ট্যাক্স হেভেন বা করস্বর্গে অর্থ পাঠাচ্ছেন সম্পদশালীরা। এসব স্থানে কম্পানির মালিকের পরিচয় পুরোটাই গোপন থাকে।

আইসিআইজের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধনী ও তারকারা অফশোর ব্যবস্থা ব্যবহার করে প্রমোদতরি ও ব্যক্তিগত জেট ক্রয়, আবাসনে বিনিয়োগ এবং কর কর্মকর্তাদের চোখ এড়িয়ে নিজের ও পরিবারের সম্পদ অন্য দেশে জমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *