গোড়ার গলদে ডুবছে ঢাকা

 গোড়ার গলদে ডুবছে ঢাকা

ঢাকা নগরায়ণের শুরু থেকে পানি নিষ্কাশনের কথা বিবেচনা করা হয়নি। এজন্য সামান্য বৃষ্টিতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ নগরের বাসিন্দাদের জলজট ও জলাবদ্ধতার ধকল সামলাতে হচ্ছে।

এখন শত শত কোটি টাকা খরচ করে কৃত্রিম পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলেও কার্যত কোনো সুফল মিলছে না। আদর্শ নগর কাঠামোর গোড়ার গলদে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলছে না ঢাকাবাসীর।

নগরপরিকল্পনাবিদদের মতে, পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী যে কোনো নগরে সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত থাকার কথা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। জলাশয় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ, সবুজ উদ্যান ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। কংক্রিট আচ্ছাদিত থাকবে ৪০ থেকে ৫০ ভাগ এবং প্রতি একর জায়গায় মানুষের বসবাস থাকবে ১০০ থেকে ১২০ জন।

নগরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে মোট আয়তনের ৫০ শতাংশ ঘরবাড়ি, মার্কেট, প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কলকারখানা করে ব্যবহার করতে হবে। আর ৫০ ভাগ এলাকা পানি নিষ্কাশন, চলাচল, সবুজায়ন, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ নানাবিধ সুবিধার জন্য থাকবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০১৯ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার ক্ষেত্রে পরিকল্পনার মানদণ্ড তেমন কিছুই মানা হয়নি। সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ, সবুজ উদ্যান রয়েছে ১০ শতাংশ, জলাশয় রয়েছে ৫ শতাংশ। আর কংক্রিট আচ্ছাদিত হয়েছে প্রায় ৭৮ শতাংশ।

এছাড়া কংক্রিট আচ্ছাদিত বা ভবন, স্থাপনা ও শিল্প-কলকারখানা এলাকাগুলোয় মাটিতে পানি পুনর্ভরণের জন্য বাধ্যতামূলক উন্মুক্ত জায়গা রাখার বিধান থাকলেও ঢাকার ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। নগর কাঠামোর মৌলিক ত্রুটি রেখে এ শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সমাধান সম্ভব নয়।

নগরের বাসযোগ্যতা বিবেচনায় প্রতি একরে ১০০ থেকে ১২০ জন বসবাস করার কথা। অথচ বর্তমানে ঢাকার প্রতি একরে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন মানুষ বসবাস করছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।

সে হিসাবে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বোচ্চ ৯০ লাখ ৪০ হাজার ২০০ জন লোক বসবাস করবে। অথচ বাস্তবে বসবাস করছেন ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪ হাজার মানুষ, যা ধারণক্ষমতার চেয়ে তিনগুণেরও বেশি। ঢাকার কিছু কিছু এলাকার একরপ্রতি জনঘনত্ব অনেক বেশি। পুরান ঢাকার লালবাগে প্রতি একরে বসবাস ৬৮০ জন, চকবাজার এলাকায় ৫২৭ এবং কতোয়ালি এলাকায় ৪১১ জন।

পরিকল্পনার মানদণ্ডের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানীর আয়তন ৩০৫ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ ঢাকার দুই সিটিতে জমির পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৩৫ একর। এ দুই সিটিতে সড়ক, নর্দমা ও ফুটপাত সুবিধা রয়েছে ৭ শতাংশ। আয়তন বিবেচনায় এ সুবিধা থাকার কথা ১৫ হাজার ৬৭ একর এলাকা। জলাশয় রয়েছে ৫ শতাংশ।

আয়তন বিবেচনায় জলাশয় থাকতে হবে ৭ হাজার ৬৫৭ একর। সবুজ উদ্যান রয়েছে ১০ শতাংশ। আয়তন বিবেচনায় থাকা দরকার ১৫ হাজার ৬৭ একর।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যমতে, বর্তমানে ঢাকায় সড়ক রয়েছে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার। ড্রেনেজ লাইন রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। আদর্শ নগর কাঠামো মানদণ্ড অনুসরণ করে করলে সড়ক ও নর্দমার পরিমাণ ২ থেকে ৩ গুণ বাড়বে। এর বাইরে খাল রয়েছে ৩৯টি এবং কয়েকটি লেক আছে। বক্সকালভার্ট রয়েছে ১০ কিলোমিটার।

খালগুলোর মধ্যে ২৬টি তদারকি করছে ঢাকার দুই সিটি এবং বাকি ১৭টি রয়েছে রাজউক ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে। এ খালগুলো দুই সিটিকে বুঝিয়ে দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, অপরিকল্পিতভাবে এ শহর গড়ে ওঠার কারণে আদর্শ ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এরপরও ঢাকা শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকায় তিন থেকে চারগুণ জনসংখ্যা ও অবকাঠামো লক্ষ করা যাচ্ছে।

তিনি বলেন, নগর এলাকার সবুজ, খোলা জায়গা, পার্ক, উদ্যানসহ বৃষ্টির পানিকে মাটিতে পুনর্ভরণের মাধ্যমে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া জলাশয়গুলো অর্থাৎ খাল, লেক, পুকর, ডোবা বৃষ্টির পানি ধারণের মাধ্যমে নিষ্কাশনে বড় ভূমিকা পালন করে।

তিনি আরও বলেন, পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুসরণ না করার কারণে ঢাকা শহরে কংক্রিট আচ্ছাদিত এলাকা বেশি হয়ে গেছে। এজন্য বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে পুনর্ভরণের সুযোগ কমে গেছে। আর কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধারণক্ষমতার চেয়ে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি বেশির কারণে সামান্যতেই অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুসরণ করে সবকিছু রাখা হলে বর্ষার মৌসুমে ঢাকার প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা থাকত না। আমাদের দুর্ভাগ্য-সেভাবে শহর গড়ে তুলতে পারিনি।

এ বিষয়ে রাজউকের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য যে কোনো শহরে পর্যাপ্ত পরিমাণ পুকুর, ডোবা, জলাশয় থাকা দরকার। ঢাকার উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেগুলো বিবেচনা করা হয়নি।

এছাড়া শহরের সিংহভাগ এলাকা কংক্রিট আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে প্রাকৃতিক নিয়মে মাটিতে পানি পুনর্ভরণ হচ্ছে না। ফলে সব পানির চাপ ড্রেনে পড়ছে। এভাবে পানি নিষ্কাশন করে ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করতে হলে পুকুর, ডোবা, জলাশয়গুলো উদ্ধার করতে হবে। শহরে ব্লক বেইজড ডেভেলপমেন্ট করে পুকুর, জলাশয় সৃষ্টি করতে হবে। এর বাইরে এ শহরে জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, পুরান ঢাকা ঘিঞ্জি এলাকা হলেও এখনো বেশকিছু পুকুর রয়েছে। নতুন বা আধুনিক ঢাকা বলতে আমারা যেসব এলাকাকে বুঝি, সেখানে কোনো পুকুর বা জলাশয় রাখা হয়নি। এসব এলাকার পার্ক ও খেলার মাঠগুলোকেও কংক্রিট আচ্ছাদিত করে ফেলা হচ্ছে।

খাল উদ্ধারে কার্যকর তৎপরতা নেই : ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা নিরসনে ব্যর্থ হওয়ায় ঢাকার দুই সিটিকে খাল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর দায়িত্ব পাওয়ার পর খালগুলোর টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি দুই সিটি।

বর্তমান চিত্র হচ্ছে-একদিকে খালের আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে, অন্যদিকে আবার সেসব আবর্জনায় পূর্ণ হচ্ছে। খালের আবর্জনা পরিষ্কার করে খালের পাড়ে রাখা হচ্ছে। এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে খাল পরিষ্কার করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। আগের তুলনায় পানির প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও টেকসই সমাধান বহুদূর বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ২৬টি খাল নিয়ে ঢাকার দুই সিটির অধীনে দেওয়া হয়েছে। সেগুলো পরিষ্কার করে প্রবহমান রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে দুই সিটি করপোরেশন। একই সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ড, রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কাছ থেকে আরও ১৩টি খাল, স্লুইচগেট, পাম্প স্টেশন বুঝে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসি মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল, নর্দমা ও বক্সকালভার্ট পাওয়ার পর সেগুলো এবং ডিএসসিসির নিজস্ব নর্দমাগুলো পরিষ্কার করা হয়েছে। সেগুলোয় পানির প্রবাহ ঠিক রাখতে রুটিন পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার রাজধানীতে জলজট ও জলাবদ্ধতা স্থায়ীকাল কম হচ্ছে। দুই বছরের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মিলবে।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর আমরা খাল ও ড্রেনগুলো পরিষ্কার, দখলমুক্ত ও সংযোগ তৈরি করে টেকসই প্রবাহ নিশ্চিতের লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছি। এটা বছরজুড়ে চলমান থাকবে।

জলে যাচ্ছে ড্রেনেজ উন্নয়ন বরাদ্দ : বিগত এক যুগে ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতা কমার চেয়ে বেড়েছে কয়েকগুণ। টেকসই পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ গ্রহণ না করায় খালগুলোর দখল-ভরাট বেড়েছে। চারপাশের নদনদীর সঙ্গে খাল ও নর্দমা পানি নিষ্কাশন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

পাম্পিংনির্ভর হয়ে পড়েছে ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি সর্বত্র। সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে রাজধানীবাসী।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮-২০০৯ অর্থবছর থেকে ২০২০-২০২১ অর্থবছর পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসা ঢাকার খাল, ড্রেন পরিষ্কার ও সংস্কারে খরচ করেছে প্রায় ৯০৬ কোটি টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) যৌথভাবে খরচ করেছে ১ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) খরচ করেছে প্রায় ১০৮ কোটি টাকা।

আরও জানা যায়, ঢাকা ওয়াসা খাল, ড্রেন পরিষ্কারের জন্য মূলত এসব অর্থ খরচ করেছে। সর্বশেষ তিন বছরের ফাইলপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে, খালের রুটিন সংস্কার কাজে খরচ হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। আর দুটি প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ১৫৩ কোটি টাকা।

এর আগের তথ্যবিশ্লেষণ করে দেখা যায়, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় ২৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০১৩ সালে শেষ করেছে ঢাকা ওয়াসা। ঢাকার দুই সিটি ফুটপাত, ড্রেনেজ ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বছরে প্রায় ১০০-১৫০ কোটি টাকা খরচ করেছে। আর বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমেও দুই সিটির ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে অর্থ খরচ হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *